শনিবার , ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং , ১লা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ , ৭ই রবিউস-সানি, ১৪৪০ হিজরী
NEWSPOST24
এমপি আউয়ালের সঙ্গে স্বাধীনতা বিরোধীদের সখ্য এমপি আউয়ালের সঙ্গে স্বাধীনতা বিরোধীদের সখ্য
দৈনিক কালেরকন্ঠ থেকে : পিরোজপুর প্রতিনিধি   : ৭ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০ এমপি আউয়ালের বড় ছেলে আব্দুর রহমান ইউনাইটেড রয়েল ক্লাব নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা... এমপি আউয়ালের সঙ্গে স্বাধীনতা বিরোধীদের সখ্য

দৈনিক কালেরকন্ঠ থেকে :

পিরোজপুর প্রতিনিধি   :

৭ আগস্ট, ২০১৬ ০০:০০

এমপি আউয়ালের বড় ছেলে আব্দুর রহমান ইউনাইটেড রয়েল ক্লাব নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে তরুণ ছাত্রদের মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায় যুক্ত করেন। ক্লাবটিকে ছাত্রলীগের প্যারালাল সংগঠন হিসেবেও চালানোর চেষ্টা হয়েছে। কেউ ছাত্রলীগ করতে হলে আব্দুর রহমান ওরফে দাদাভাইয়ের স্বাক্ষর লাগত। লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করে ওই ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা হতো। এলাকায় যে কেউ তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করলে ঢাল হিসেবে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ব্যবহার করা হতো। এমনকি টেন্ডারবাজি, জমি দখল থেকে শুরু হরে আধিপত্য বিস্তার—সব কিছুতেই ছিল ওই ক্লাব। এমপি চাইতেন পিরোজপুরের ছাত্রলীগ তাঁর স্ত্রী লায়লা ইরাদ ও সন্তানদের ব্যক্তিগত বাহিনীতে পরিণত হোক। তাঁর কথা না শোনায় ছাত্রলীগের বর্তমান প্রচার সম্পাদককে দুই মাস কারাগারে রাখা হয়। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জেলা ছাত্রলীগ নেতারা এসব কথা বলেন।

এর আগে গত শুক্রবার পিরোজপুরের নবগঠিত ছাত্রলীগের কমিটির বিরুদ্ধে ঢাকার সেগুনবাগিচার একটি রেস্টুরেন্টে পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম এ আউয়াল এক সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি নবঘোষিত জেলা ছাত্রলীগের কমিটির সদস্যদের স্বাধীনতাবিরোধী, অছাত্র, খুনি, মাদক ও নারী ব্যবসায়ী বলে উল্লেখ করেন।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শুভ্রজিৎ হালদার বাবু ও সাধারণ সম্পাদক খায়রুল ইসলাম মিঠু স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাধারণ সম্পাদক খায়রুল ইসলাম মিঠু। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দীর্ঘ ১২ বছরে পিরোজপুরে ছাত্রলীগের কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে দেননি এমপি আউয়াল। ২০১০ সালে ফয়সাল মাহাবুব শুভকে সভাপতি ও তানভীর মুজিব অভিকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি সাত সদস্যের কমিটি ঘোষণা করেন তৎ্কালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি মাহামুদ হাসান রিপন ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন। এ কমিটি এক বছর হলেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। এমপির কথামতো না চলায় বিনা কারণে তৎ্কালীন ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়সাল মাহাবুব শুভকে কারাবরণ করতে হয়। তাঁরই (এমপির) ষড়যন্ত্রে ছাত্রত্ব বাতিল হয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ছয়জনের। এরপর ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম ১১ সদস্যের একটি কমিটি ঘোষণা করেন। ওই কমিটিও তাঁর (এমপির) চক্রান্তে ভেঙে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১২ বছর পর গত ২০ জুন ১৬২ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এ কমিটি তাঁর পছন্দ না হওয়ায় তিনি জেলা ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। এমপি আউয়াল তাঁর সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের যেসব নেতার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন তাঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে এমপি ও তাঁর ছেলের অন্তরঙ্গভাবে তোলা বহু অনুষ্ঠানের ছবি ছাত্রলীগ নেতারা গতকাল তুলে ধরেন। প্রত্যেক ছাত্রের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রমাণপত্রও এ সময় উপস্থাপন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র নেতারা আরো বলেন, সংসদ সদস্য ছাত্রলীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের স্বাধীনতাবিরোধী বলছেন। কিন্তু তিনি নিজে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে সখ্য রাখেন। উদাহরণ দিয়ে তাঁরা বলেন, গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির মিছিল থেকে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হক শিকদারের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হয়েছিল। সেই হক শিকদার এখন সংসদ সদস্যের সফরসঙ্গী হিসেবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁকে দলীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। আর ত্যাগী নেতাকর্মীদের সংসদ সদস্য দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। এ সময় তাঁর (এমপির) শিক্ষাগত যোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করে ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, যদি সাহস থাকে, তাহলে তিনি যেন তাঁর এসএসসি পাসের সনদ জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, এমপি তাঁর ছেলেদের জিপিএ ৫ পাওয়া নিয়ে বড়াই করেন। আমরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, কোনো পরীক্ষার খাতায় তাঁর ছেলেদের হাতের লেখা খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শুভ্রজিৎ হালদার বাবু বলেন, গত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নৌকা মার্কার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করান। ওই প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকাও হাতিয়ে নেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের সর্বপ্রথম প্রতিবাদ করেন তাঁরই দুই সহোদর পিরোজপুর পৌরসভার তিনবার নির্বাচিত মেয়র মো. হাবিবুর রহমান মালেক ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান খালেক। তাঁরা নৌকা মার্কার প্রার্থীর পক্ষে দিনরাত পরিশ্রম করে নৌকা মার্কা প্রতীককে বিজয়ী করতে সহযোগিতা করেন। ভাইয়ের অবৈধ সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করায় ভাইদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে জেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তাঁদের বিরুদ্ধে এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে মিছিল করতে বলেন এমপি আউয়াল। ওই সময় জেলা ছাত্রলীগকে নৌকার বিপক্ষে গিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে বলেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাতে অস্বীকৃতি জানালে সংসদ সদস্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। এমনকি সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের ভোটে নির্বাচিত ভিপি বায়জিদকে নির্বাচনের ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও তিনি শপথ নিতে দেননি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বিষয়গুলো জানানো হলে তাঁরা স্থানীয় ছাত্রলীগকে আপসহীন থাকতে বলেন এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, উনি (এমপি) এখন ছাত্রলীগের কমিটির বিরুদ্ধে আঙুল তোলেন। অথচ জেলার প্রতিটি কমিটিতে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে জামায়াত-বিএনপির হাইব্রিড বহু নেতাকে দলে পুনর্বাসন করেছেন, যাঁরা শুধু এমপি ও তাঁর স্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী চলেন। এমপির ছেলেমেয়ে প্রত্যেকে আলাদা করে কোটি টাকার গাড়ি ব্যবহার করেন। আর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ব্যক্তিগত খরচায় দলীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। এ সময় তাঁরা জানান, জমি দখল, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলা, মামলা, প্রশাসনের লোকদের তল্পিবাহক করা সম্পর্কে এলাকার সবাই জানে। তিনি দলকে আজ এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছেন যে নিজেই এলাকায় ঢুকতে পারছেন না। তাঁর  সংবাদ সম্মেলন করতে হচ্ছে ঢাকার রেস্টুরেন্টে। জেলা আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী তাঁর দুর্নীতি আর অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে কথা বলে আজ প্রায় রাজনীতিই ছেড়ে দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জেলা ছাত্রলীগের প্রায় সব নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা এমপি আউয়ালের সংবাদ সম্মেলনের তীব্র নিন্দা ও বিরোধিতা করেন। এমপি তাঁর দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে তাঁরাও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী কর্মসূচি নিতে বাধ্য হবেন বলে ঘোষণা দেন।

Comments

comments

Scroll Up

Send this to a friend