শুক্রবার , ১৯শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ , ৯ই সফর, ১৪৪০ হিজরী
NEWSPOST24

আরবী হরফে বাংলা ও ধর্ষিত বেলুচ নারী

বিভাগঃ মুক্ত মত ১৬/০৯/২০১৬ নিউজ পোস্ট ডেস্ক

আরবী হরফে বাংলা ও ধর্ষিত বেলুচ নারী আরবী হরফে বাংলা ও ধর্ষিত বেলুচ নারী
জহিরুল হক বাপি : ভাষা হলো মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। প্রত্যেক জাতির নিজ নিজ ভাষা আছে। নিজ ভাষা আলাদা করে শিখতে হয়... আরবী হরফে বাংলা ও ধর্ষিত বেলুচ নারী

জহিরুল হক বাপি :

ভাষা হলো মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। প্রত্যেক জাতির নিজ নিজ ভাষা আছে। নিজ ভাষা আলাদা করে শিখতে হয় না। জীবনের প্রয়োজনে বা বিভিন্ন কারণে আমরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষা শিখি। কিন্তু তা কখনওই মাতৃভাষা নয়। একটি দেশের ভ’খন্ডের মানুষ বংশ পরম্পরায় যে ভাষায় কথা বলে তা তার মাতৃভাষা। অন্য একটি ভাষা শিখতে গেলে অনেক কায়দা কানুন অনুসরন করতে হয়। শব্দ, অক্ষর, অর্থ মূখস্ত করতে হয়। ব্যাকরণের দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়।

কিন্তু মায়ের ভাষা, মাটির ভাষা শিখার জন্য আলাদা করে শব্দের অর্থ মূখস্ত করতে হয় না, ব্যাকরণ মূখস্ত করতে হয় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় : বাঙালি একটি ছেলে বা মেয়ের বাংলায় কথা বলার জন্য আলাদা করে ব্যাকরণ মূখস্ত করে বাক্য তৈরি করতে হয় না। কিন্তু বাঙালি একটি ছেলে বা মেয়ে ইংরেজীতে কথা বলতে গেলে আলাদা করে ব্যাকরণ মূখস্ত করে বাক্য তৈরি করতে হয়। তেমনি কোন ইংরেজ যদি বাংলা ভাষায় কথা বলতে চায় তবে তাকে বাংলা ব্যাকরণ মূখস্ত করতে হবে, শব্দার্থ মূখস্থ করতে হবে। নিজ নিজ ভাষা শুনে শুনে, রক্তধারার মধ্য দিয়েই মগজে জায়গা করে নেয়।

Abdul-Matin-3কোন জাতিকে মেরুদন্ডহীন, স্বপ্নহীন, আতœসম্মানবোধহীণ করতে চাইলে প্রথমেই তার ভাষা, সংস্কৃতি ধ্বংস করে দিতে হয়। তাইপশ্চিম পাকিস্তানীরা প্রথম আঘাত করে আমাদের ভাষার উপর, আমাদের সাংস্কৃতির উপর।

ভাষা নিয়ে দড়ি টানাটানি শুরু হয় ১৯৪৭ এর আগেই, যখন নির্ধারিত হয় বৃটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাবে। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে উর্দু। তার এ প্রস্তাব সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ছিল। কারণ উর্দুতে পাকিস্তানের মাত্র ৩% ভাগের বেশি মানুষ কথা বলতো। পাকিস্তানের ৫৭% মানুষের ভাষা বাংলা বলে ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবে বাংলা। ১৯৪৭ এ পাকিস্তান স্বাধীন হয়।

১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র ভাষা প্রশ্নে পশ্চিশ পাকিস্তান উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রথম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় করাচীতে। এ সম্মেলনে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশ থেকে যোগ দেন জনশিক্ষা বিভাগের কুদরত-ই-খুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ হাসান, শিক্ষা মন্ত্রী আব্দুল হামিদ, শিক্ষা সচিব ফজলে করিম, স্বাস্থ্য মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার, প্রৌকশল মহাবিদ্যালয়ে প্রিন্সিপ্যাল হাকিম আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যক্ষ পি. মাহেশ্বরী, সিলেট কলেজের অধ্যক্ষ আই.এইচ জুবেরী। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রী ফজলুর রহমান উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে অভিমত দেয়। পূর্ববঙ্গ থেকে অংশগ্রহনকারীদের একাংশ এর বিরোধীতা করেন।

অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে তমুদ্দিন মজলিস প্রথম রাষ্ট্র ভাষা বাংলা না করার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু করে। ছাত্ররা ৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় ক্যাম্পসে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবীতে সমাবেশ করে। ৩০ ডিসেম্বর তমদ্দিন মজলিস অধ্যাপক নুরুল হক ভূঁইয়াকে আহ্বায়াক করে “রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করে।

পাকিস্তানের প্রায় ৫৭% ভাগ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা । বাকী ৪৩% ভাগ মানুষ কথা বলতো পশতু, বেলুচ, সিদ্ধী, কাশ্মীরী, উর্দুতে। এই ৪৩% ভাগের মধ্যে উর্দুতে কথা বলতো মাত্র ৩% মানুষ।

১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে পশ্চিম পাকিস্তানীরা চেষ্টা শুরু করে বাংলা অক্ষরের পরিবর্তে আরবী অক্ষরে বাংলা লিখা প্রবর্তনের। ৯ মার্চ গঠন করা হয় “পূর্ব বাংলা ভাষা কমিটি”। এ কিমিটি দীর্ঘ দিন কাজ করে। বিভিন্ন সময় এর সম্পাদকদের মধ্যে ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা, শেখ শরফুদ্দিন, আবু সাইদ মাহমুদ। কমিটির সভাপতি ছিলেন মাওলানা আকরাম খাঁ। কমিটি গঠন করা হয় মূলত বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার জন্য। চলতে থাকে বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার চেষ্টা। বাংলা অক্ষরকে আরবী লিখার প্রচলনের চেষ্টা হিসাবে ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাকে দলে টানার চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু তিনি রাজী হননি। তিনি উল্টা বলেন, তিনি বাংলা অক্ষরে উর্দু লিখতে চান। ৫১ সালের সেপ্টম্বর মাসে পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা দপ্তর থেকে নোটিশ জারি করা হয় । যার মূল বক্তব্য ছিল : স্কুলের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনীর শিক্ষার্থীরা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে শুধূ আরবী অক্ষর শিখবে। তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ানো হবে আমপারা ও চতুর্থ শ্রেণীতে উর্দু অক্ষর শেখানো হবে। বিষয়টি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রনোদিত। এখানে ধর্মের কোন মায়াজাল ছিল না। পুরোটাই ধর্ম ব্যাবহার করে রাজনিতী।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ন্যায্য দাবী বারবারই উপেক্ষিত হতে থাকে। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারী ঘটিত হয় “সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ”। পরিষদ থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারী হরতাল ও সমাবেশের ঘোষনা দেওয়া হয়। ঐ দিন ছিল পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশন বসার নির্ধারিত তারিখ। অবস্থা বেগতিক দেখে পাকিস্তানি সরকার ২০ ফেব্রুয়ারী থেকে ১৪৪ ধারা জারি করে। ২১ ফেব্রুয়ারী সকাল ১০টার দিকে গাজীউল হকের সভাপত্বিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা চত্বরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় ।

সমাবেশেই সিদ্ধান্ত হয় ১৪৪ ধারা না মানার। উত্তাল জন সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আব্দুস সামাদ আজাদ ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার নিয়ম বলেন। দশজন দশহন করে মিছিল করে রাস্তায় বের হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর মোজফফর আহমদ চৌধূরী এ সিদ্ধান্তকে সমর্থণ জানিয়ে কলা ভবনের গেট খুলে দেন।

বের হয় প্রথম “দশজনি মিছিল”। ভাষার দাবীতে মিছিল। ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে প্রথম গ্রেফতার হন হাবিবুর রহমান শেলী। তিনি প্রথম দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। দ্বিতীয় ১০ জনি মিছিলের নেতৃত্ব দেন আব্দুস সামাদ আজাদ ।অবস্থা হলো এমন দশ করে মিছিল নিয়ে বের হয় আর সাথে সাথেই গ্রেফতার। হঠাৎই পুলিশ লাঠি চার্য শুরু করে। এতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদেও, সমাবেশের, বিক্ষোভের ভাষা পরিবর্তন হয়ে যায়। সমাবেশকারীরা মারমূখী হয়ে উঠে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল শুরু ছোঁড়া শুরু করে।

কলাভবনের বিক্ষভ ছড়িয়ে পড়ে আশে পাশের এলাকাগুলোতেও। পুলিশও লাঠিচার্য ও গ্রেফতার করতে থাকে। যত বেশি পুলিশী নির্যাতন বাড়ে আন্দোলনও তত বেশি তীব্র হতে থাকে। এরপর বলা নেই কওয়া পুলিশ হঠাৎ গুলি ছুড়তে থাকে যেখানে বর্তমানে শহীদ মিনার অবস্থিত সেখান থেকে। গুলিবর্ষনের শুরুতে গফরগাওয়ের আব্দুল জব্বার, মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের রফিকউদ্দীন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত ও শিল্প বিভাগের পিয়ন আব্দুস সালাম গুলি বিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের চার-পাশের অবস্থা হয়ে উঠে নরক তুলল। ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি, টিয়ার গ্যাস, গুলিতে আহতদের পানি পানি করে চিৎকার। ঘড়ির কাটা তখন তিনটার ঘর পার করেছে।

২১ শে ফেব্রয়ারীর গুলি চালানোর ঘটনায় পুরো পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। দেশের অন্যান্য স্থন থেকেও প্রতিবাদ, বিক্ষোভর ঝড় শুরু হয়। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারী ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাঠে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অনুষ্ঠিত হয় গায়েবানা জানাযা। সর্বস্তরের মানুষ এ জানাযায় অংশ গ্রহন করে। জানাযা শেষে একটি মিছিল বের হয়। বলা হয় তখন পর্যন্ত এটি ছিল ঢাকার সবচেয়ে বড় মিছিল। মানুষের ঢল নামে সেদিন। শান্তিপূর্ণ মিছিলটি কার্জণ হল ও হাইকোর্ট এলাকার মাঝামাঝি এলে বিনা কারণে, উস্কানীতে গুলি চালায় পুলিশ, ইপিআর ও সেনাবাহিনী।

সেদিন পুলিশের সাথে ইপিআরও ছিল। এদিন গুলিতে নিহত হলেন হাইকোর্টের কর্মচারী সফিউর রহমান এবং রিক্সাচালক আউয়াল। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারী গুলি ও বেয়োনেট চার্যে আট জন নিহত হয়েছে বলে ধারনা করা হয়। কয়েকটি লাশ পুলিশ গুম করে ফেলে। এর ভিতর রাজমিস্ত্রী হাবিবুর রহমানের সন্তান ৮/৯ বছরের অহিউল্লাহ ছিলেন। পুলিশ শিশু অহিউল্লার লাশ গুম করে।

এরপরও পদ্মা মেঘনা, যমুনাতে বয়ে গেছে অনেক জল। বৃষ্টি পানির মতো রক্তধারায় লাল হয়েছে বাংলার মাটি। তারপর স্বীকৃতী পায় বাংলা। বাংলার পথ ধরেই বাংলাদেশ। সে ইতিহাস সবার জানা।

পৃথিবীর পত্রিকায় ২০১৬ সালে খবর হয় ইউনেস্কোর ঘোষনা অনুযায়ী বাংলা ভাষা পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর ভাষা। আর বাংলার শত্রু উর্দুভাষীদের নিয়ে খবর হয় : ৪০ জন বেলুচ নারীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পাকিস্তানী সেনাদের ধর্ষনের জন্য। সৎকারের অভাবে রাস্তায় পড়ে আছে বেলুচদের লাশ। বাংলা ভাষায় কথা বলা অনেকেই আজও ক্রমাগত শত্রুতা করে যাচ্ছে বাংলার সাথে।

এ শত্রুতা কিছুটা রাজনৈতিক মতবাদের কারণে, কিছুটা ধর্মের নামে। কোন রাজনিতীর নামে এরা সমর্থণ করে পাকিস্তানকে? ঈদের, জুম্মার নামাযে বোম খাওয়ার জন্য নাকি ধর্ষনের জন্য রাষ্ট্রীয় সহযোগীতার জন্য? ধর্মকি এটা সমর্থণ করে? করে না। ইসলামে এমন আচরনের জন্য কঠিন শাস্তি। মগজে অন্ধত্ব আর প্রতিহিংসা। এদের কোন রাজনিতী নেই, এদের কোন ধর্ম নেই।

কারেই বা কি বলি!!!! আজও সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন হয়নি। আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড শৃধূমাত্র ইংরেজীতে। মাঝে মাঝে মনে হয় ভাষা শহীদরা কি বাংলাদেশে ইংরেজীর এ গৌরব গাঁথার জন্য জীবন দিয়ে ছিলেন। কেউ ভাববেন না আমি ইংরেজীর বিরুদ্ধে। কিন্তু নিয়ম ও সৌন্দর্য হচ্ছে আগে, উপরে বড় করে থাকবে মাতৃভাষা তার নিচে, পাশে একটু ছোট করে থাকবে বিদেশী ভাষা। এসব দেখার মতো আমাদের কি কেউ নেই?!!!

লেখক : জহিরুল হক বাপি ( লেখক, ব্লগার ও অনলাইন একটিভিস্ট)

Comments

comments

Send this to a friend