শুক্রবার , ১৯শে অক্টোবর, ২০১৮ ইং , ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ , ৯ই সফর, ১৪৪০ হিজরী
NEWSPOST24
সোনার বাংলায় “চিকিৎসা ব্যবস্থায়” ভয়াবহ ব্যাধি! সোনার বাংলায় “চিকিৎসা ব্যবস্থায়” ভয়াবহ ব্যাধি!
সুমন দেবনাথ : আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে আধুনিক অর্থনীতির জনক এডাম স্মিথ বলে গেছেন অর্থনীতিতে দারিদ্রের কথা আর তারও অনেক পরে অধ্যাপক... সোনার বাংলায় “চিকিৎসা ব্যবস্থায়” ভয়াবহ ব্যাধি!

সুমন দেবনাথ :

আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে আধুনিক অর্থনীতির জনক এডাম স্মিথ বলে গেছেন অর্থনীতিতে দারিদ্রের কথা আর তারও অনেক পরে অধ্যাপক নার্কস আবিষ্কার করেছেন "দারিদ্রের দুষ্টচক্র" এর থিওরি। সংক্ষেপে সবার বোধগম্য করে এটা ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় "যদি কোন পরিবার তিন প্রজন্ম ধরে দারিদ্রের যাঁতাকলে আটকে যায়, তাহলে ধরে নেয়া যায় যে সেই পরিবার দারিদ্রের দুষ্টচক্রে আটকে গেছে"।

যাই হোক আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় এটা না! ভূমিকার প্রয়োজনে ভূমিকা দিলাম! গতকাল সকালে ডাক্তারদের ৪০% কমিশন বানিজ্য নিয়ে লিখার পরেই আবিষ্কার করলাম ডাক্তারদের এই পথে নিয়ে আসার মুল হোতা কারা? কেন, কিভাবে তারা ডাক্তারদের এই পথে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। তা নিয়ে সারা দিন একটু ঘাটাঘাটি করার পরেই জানতে পারলাম নিম্নে বর্নিত ভয়ংকর সব তথ্য! ক্লিনিক, ডায়াগনোষ্টিক সেন্টার, ঔষধ কোম্পানি মুলত এরাই মূল হোতা এই তিন ব্যবসায়ী চক্র মিলে ডাক্তারদের আটকে রেখেছে এক গেঁড়াকলে অথবা বলতে পারেন একটা দুষ্ট চক্রে! তবে আমি এটাকে বলবো 'দারিদ্রের দুষ্টচক্রের' মতই "দুর্নীতির দুষ্টচক্র"।

মাত্র ৭-১০% ডাক্তার সৎ ডাক্তার বাদে বাকিসব ডাক্তাররা দুর্নীতির দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে মানবিক সেবা ভুলে গিয়ে সব সাধারন রোগীকে করে রেখেছেন বন্দী! কেমন করে? ঐ যে ব্যবসায়ী চক্রের ৪০% কমিশন দেওয়ার ফলে! আসলে আমরা এখনো আছি ৪০% কমিশনের হিসাব নিয়া। এটা যে এখন কত স্মার্ট হইছে তা যদি জানতাম তাহলে আমি নাকি লন্ডনি এমবিএ বাদ দিয়া দেশে চলে এসে 'রোগী রেফারারর' লিষ্টে নাম উঠাইতাম...!!

বাহ্ কি লোভনীয় অফার! তাইনা? ঔষধ কোম্পানি/ মেডিকেল খাতের কর্পোরেট ব্যাবসায়ীরা ডাক্তারদের এখন এমন সব সুযোগ সুবিধা দেয় যা ভাবতেই পারবেন না!! তাই ৪০% কমিশনের প্যাথলজি সুবিধার দিকে এখন ডাক্তারদের নজর কম তাই এই কমিশন খাত এখন নন-ডাক্তার রেফারার বা কোয়াকের দখলে। তবে ডাক্তাররাও বেনিফিট নিচ্ছেন এটাও সত্য। তবে মূল ক্ষমতা ব্যবসায়িদের কারন তাঁরাই নিজেদের পকেট ভারী করতে ডাক্তারদের মোটিভেট করছে অর্থাৎ মদদ দিচ্ছে! প্রকৃতপক্ষে ডাক্তাররাও ঐ দুর্নীতির দুষ্টচক্রে জিম্মিও বটে।

কেন জিম্মি জানেন? যে ডাক্তার 'টেস্ট' দরকারের চেয়ে বেশী লিখেন না, তাকে ঐ প্রতিষ্ঠান বের করে দেয়। তখন ডাক্তার কি করবে? না খেয়ে রাস্তায় থাকবে? এসব সৎ ডাক্তারদের শুধু চেম্বার চেন্জ করা লাগে। মনে করেন- হার্টের ডাক্তারের চেম্বারঃ ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের মালিক সরাসরি বলবে আপনি আমাকে প্রতিদিন ১০টা বা ১৫ টা ইকোকার্ডিওগ্রাফি 'টেষ্ট' দিতে হবে না দিলে দিলে এখানে চেম্বার করে পুষাবে না আপনার! জেনে শুনে আমি তো আর নিজের ব্যবসায়িক ক্ষতি করতে পারি না! যেখানে আছে আমার কোটি টাকার বিনিয়োগ।

উপরের নিয়মটা সিনিয়রদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মানে যাদের রোগি আছে। নতুন ডাক্তারদের ক্ষেত্রে ডায়াগনোষ্টিক সেন্টারের চুক্তি হয় এমন: যেমন প্রতিদিন চেম্বারে আসলে ঐ প্রতিষ্ঠান ডাক্তারকে দিবে দৈনিক ৫০০০/- টাকা করে দেবে অর্থাৎ ডাক্তারের ফিক্সড মাসিক ইনকাম মাসে ১.৫ লাখ। রোগি যাই হউক ব্যাপার না। রোগী দেখার ফি ঐ প্রতিষ্ঠান নিয়ে নিবে! অর্থাৎ রোগী দেখবে ডাক্তার ফি নিবে ওরা! এক্ষেত্রে ডাক্তারের কাজ হলো তাদের ইচ্ছামতো 'টেষ্ট' লিখবে ডাক্তার।

এই পদ্ধতি অনেকটা বেতনের মতো চেম্বার! সিনিয়র ডাক্তারদের এরা কিভাবে কিনে জানেন? দেশ থেকে যত ডাক্তার বিদেশে সেমিনার সিম্পোজিয়ামে এটেন্ড করেন এসব ট্যুরের খরচ বিবিধ ঔষুধ কোম্পানি বহন করে। ডাক্তার ভেদে অনেকের পারিবারিক ট্যুরের খরচও ঔষধ কোম্পানিরা দেয়। আবার ট্যুর শেষে শপিংসহ গিফট্ হাম্পার তো আছেই! আগে ঔষধ কোম্পানিরা মেডিসিন সেম্পল দিতো, এখন মান্থলি 'খাম' যায় নিয়মিত। এরপরের ধাপ ডাক্তারের বাসা বাড়ীর জিনিস দেয়া যেমন টিভি, ফ্রীজ ইত্যাদি।

এমন কি প্রাইভেট কারও দেয়া হচ্ছে চুক্তিতে! শুধু প্রতি প্রেসক্রিপশনে ৩টা ঔষধ লিখবেন নির্দিষ্ট দিন। উপরওয়ালাই জানেন এই বাড়ির বিল কবে পরিশোধ হয়! শুধু তাই না চারটা ঔষধ কোম্পানি মিলে এক কোটি টাকা দিয়ে বাড়ী করতে সহায়তাও দেন সিনিওর এক্সপার্ট ডাক্তারদের যা হয় নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তির বিনিময়ে। এবার আসি আমি কেন এমবিএ শেষ করেও রোগী রেফারারর হিসাবে কাজ করবো? আমার জন্য কি আছে? এক্ষেত্রে আমার লিংক থাকবে দেশের নামী-দামী সব বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সাথে এখানে অফার হলো: রোগী ভর্তি করলে মোট বিল এর ২০% অর্থ্যাৎ এক লাখ টাকা বিল হলে ২০০০০ টাকা আমার পকেটে এজ এ্যা রেফারার! এভাবে যদি কোন রেফারার দিনে একটা করে রোগি দিতে পারে তাইলে মাসিক ৬ লক্ষ যা একজন জুনিয়র ডাক্তারের চেয়ে চারগুন বেশী।

এবার বলেন কেন আমি রেফারার হিসাবে কাজ করবো না? কেউ কেউ তো আমার চেয়ে আরও বেশী চতুর তারা কন্টাক্ট করলো ভিতরগত হাসপাতালের বিল ৮০ হাজার। যত বেশি বিল আদায় করে নিতে পারে সব রেফারারের! কি মাথায় চক্কর মারছে? এই লেখা লিখতে গিয়ে আমারও মাথায় দুই/তিনবার ঘুরান্টি মারছে! এভাবেই একজন রুগিকে ধাপে ধাপে জবাই করা হয়! এবার বুঝতে পারছেন কমিশনের হিসাব কত স্মার্ট হয়েছে? আসলেই কেউ যদি চোখের সামনে নগদ কচকচে নোট, পরিবার সহ বিদেশ ভ্রমনের সুযোগ, বাড়ি-গাড়িসহ অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে তা কেন সে নিবে না? কে চায় না একটু আরাম আয়েশে জীবন কাটাতে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ব্যাংক ভর্তি টাকা রাখতে?

মোটামুটি এই হলো দেশের মেডিক্যাল সেক্টর ও ডাক্তারদের অবস্থা! এই যে ক্লিনিক, ডায়াগনোষ্টিক সেন্টার, ঔষধ কোম্পানি ও রেফারার মিলে ভয়ংকর দুর্নীতির দুষ্টচক্র তৈরী করে রেখেছে ডাক্তারদের জন্য বিভিন্ন লোভনীয় অফার দিয়ে যা ডাক্তারদের জন্য একটা ট্রাপ এখানে একবার পা দিলে মুক্তি নাই! এই সিষ্টেমে যে একবার মোটামুটি বড় অসুখ নিয়ে হাসপাতালে ঢুকে জীবন্ত লাশ হয়ে বের হয়ে আসে কারণ ইতিমধ্যেই তার স্থাবর/অস্থাবর সম্পত্তি সব বিক্রি করা শেষ! এর থেকে কে বের করে আনবে আমাদের? আছেন কেউ?

এই দুর্নীতির দুষ্টচক্র যে শুধু রোগীদের নিঃস্ব করছে তা নয় এরা অর্থনীতিতে তৈরি করছে কালোটাকার এক বিশাল কৃষ্ণগহ্বর যা লাগাম টেনে না ধরলে শিগ্রই বিপর্যয় ডেকে আনবে! আপনারা যারা সিনিয়র ডাক্তার আছেন মাসে আয় আপনাদের প্রায় ৫ লাখের বেশী। আপনাদের আর কত টাকা দরকার? এই মহৎ পেশার মানবিকতা ফিরিয়ে আনুন দয়াকরে। আপনারা সিনিয়রা ঠিক হলেই কোস্পানিও ঠিক হবে। সাথে বিএমডিসি, স্থানীয় প্রশাসন একটিভ হলে একটিভ অনেকটাই সম্ভব এ ব্যাধি সাড়ানো!

লেখক : সুমন দেবনাথ : লন্ডন, ২৫/১১/১৬ , ইমেইল: Sumon_lus@yahoo.com

Comments

comments

Send this to a friend