অর্থ ও বাণিজ্য

অর্থ পাচার করেছে মার্কেন্টাইল কো- অপারেটিভ ব্যাংক?

 দর্পণ ডেস্ক : অবৈধ ব্যাংকিংয়ে অভিযুক্ত সমবায় প্রতিষ্ঠান ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক অর্থ পাচার করেছে কি-না তার তদন্ত করছেন আর্থিক গোয়েন্দারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) সম্প্রতি এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। জনসাধারণের আমানতের অর্থের একটি অংশ পাচার হওয়ার সন্দেহ করা হচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
 
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মার্কেন্টাইলের গত তিন বছরে লভ্যাংশ হিসাবে বিতরণ করা উচ্চ মুনাফা এবং বিবিধ খাতে ব্যয় বাবদ ৩১ কোটি টাকা কোথায় খরচ হয়েছে তা তদন্ত করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিং, জঙ্গি অর্থায়ন ও টাকা পাচারের অভিযোগ আসে। অবৈধ ব্যাংকিং বিষয়ে তদন্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস বিভাগ। বাকি অভিযোগের বিষয়ে বিএফআইইউ তদন্ত করছে। প্রথম তদন্তে অর্থ পাচার হতে পারে, এমন কিছু আলামত পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা সমকালকে বলেন, ঢাকা মার্কেন্টাইলের অবৈধ ব্যাংকিং বন্ধের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পরিদর্শনে উঠে আসা বিভিন্ন তথ্যের আলোকে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা ভাবা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে দুই লাখের বেশি আমানতকারীর কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি আমানত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আমানতকারীদের নিয়ে ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালন নীতিতে বলা আছে, প্রতি সদস্যের অনুকূলে অন্তত ১০০ টাকার শেয়ার বিতরণ করা হবে। গত জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের আমানতকারী গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৩ হাজার ৬১৭ জন। অথচ শেয়ার মূলধনের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। নিয়ম মেনে সদস্যদের মাঝে শেয়ার দেওয়া হলে বর্তমানে শেয়ার মূলধনের পরিমাণ হতো ২০ কোটি টাকার বেশি। এতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান শেয়ারের বিপরীতে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিট মুনাফা ও লভ্যাংশ দিয়ে আসছে ঢাকা মার্কেন্টাইল। বিনিয়োগকৃত মূলধনের ওপর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৩২২ শতাংশ নিট মুনাফা দিয়েছে। আগের অর্থবছরে দেওয়া হয় ২০০ শতাংশ। এ উপায়ে এর ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও পরিচালকরা দুই বছরেই পুঁজির সমান মুনাফা তুলে নিয়েছেন। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়েছিল। আগের বছর দেওয়া হয় ৪০ শতাংশ। লভ্যাংশ বিতরণের প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ হওয়ায় এর প্রকৃত সুবিধাভোগী কে বা কারা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে পরিদর্শক দলের। ফলে আসলে এর সুবিধাভোগী কে বা কারা তা খতিয়ে দেখছে বিএফআইইউ। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির নামের শেষে ব্যাংক শব্দ যুক্ত থাকায় এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো শাখার কাউন্টারে নগদ জমা ও উত্তোলনের সুযোগ থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যাংক বলে মনে করে। আর বর্তমানে ব্যাংক খাতে সুদের নিম্নমুখী প্রবণতাকে পুঁজি করে বার্ষিক ১৩ শতাংশ সুদের আকর্ষণীয় প্রলোভন দেখিয়ে আমানত সংগ্রহ করে চলেছে এ প্রতিষ্ঠান। ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ছিল ৯৪৫ কোটি টাকা এবং আমানত ৮৩৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ আমানতের চেয়ে বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে। আর এসব আমানতের অধিকাংশই নেওয়া হয়েছে সদস্যদের বাইরে বিভিন্ন গ্রাহক থেকে। অথচ সমবায় আইনে সদস্যদের বাইরে কারও কাছ থেকে আমানত নেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) আবু জাফর চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রশ্ন করার প্রস্তুতি নিয়ে দু-একদিন পর তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেন। টেলিফোনে শুধু এটুকু বলেন, 'অনেক কিছু না বুঝে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সমবায় অধিদপ্তর তাদেরকে বিভিন্ন চিঠি দিয়েছে।' তবে প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মুনিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সব ধরনের নিয়ম মেনে তারা ব্যবসা করছেন। জঙ্গি অর্থায়ন বা অর্থ পাচারের অভিযোগ সঠিক নয়। সমবায় সমিতি হয়ে ব্যাংকিং করার অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, তারা শুধু সদস্যদের কাছ থেকেই অর্থ সংগ্রহ করেন এবং তাদেরকে ঋণ দেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা স্পষ্টত ব্যাংকিং করছে। জনগণের কাছ থেকে উচ্চ সুদে আমানত নিচ্ছে। এসব আমানত ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। সমবায় অধিদপ্তরের অনুমতি না পাওয়ার পরও একের পর এক শাখা খোলার বিষয়ে জানতে চাইলে মুনিরুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক নাম ব্যবহার করে খোলা ৬টি শাখার বিষয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। প্রতিবারই শাখা খোলার আগে তারা সমবায় অধিদপ্তরে আবেদন করলেও দেওয়া হয়নি। তবে উচ্চ আদালত থেকে ৬টি শাখার বিষয়ে যেহেতু তাদের পক্ষে রায় আছে এ কারণে এসব শাখা তারা খুলেছেন। ঢাকা মার্কেন্টাইল কো অপারেটিভের ১৯৭৩ সালে নেওয়া নিবন্ধন সনদে কর্মপরিধি হিসেবে শুধু ঢাকা জেলা উল্লেখ ছিল। পরে ২০১৩ সালে জেলা সমবায় কার্যালয় থেকে নিবন্ধন সনদ সংশোধন করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরে কাজ করার অনুমতি নেওয়া হয়। অথচ বর্তমানে ৬৪ জেলায় ১১৬টি শাখা খুলে কার্যক্রম চালাচ্ছে এ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ আমানত আহরণকারী ঢাকা মার্কেন্টাইলে কোনো ধরনের করপোরেট সুশাসন নেই। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী শামসুন্নাহার প্রধান কার্যালয়ে অফিস করেন না। এটি মূলত পরিচালিত হয় এর চেয়ারম্যান গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) আবু জাফর চৌধুরীর মাধ্যমে। তারা দু'জন স্বামী-স্ত্রী। প্রতিষ্ঠানটির উপবিধি অনুসারে চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সব ধরনের দলিল-দস্তাবেজে স্বাক্ষরের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত। অর্থাৎ জনসাধারণের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ আমানত আহরণকারী করপোরেট সুশাসনবিহীন এ প্রতিষ্ঠানটি একটি পারিবারিক চক্রে আবদ্ধ, যা আমানতকারীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে এর আগে বিভিন্ন সময়ে সমবায় অধিদপ্তর থেকে ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ ব্যাংক বন্ধের উদ্যোগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এর কার্যক্রম বন্ধের সুপারিশ করে বিভিন্ন সময়ে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় সচিব, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ বিভিন্ন পক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এর কার্যক্রম বন্ধ না করা হলে এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে সেসব চিঠিতে আশঙ্কা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বর্তমানে উচ্চ আদালতে চারটি রিট বিচারাধীন রয়েছে।  সৌজন্যে : দৈনিক সমকাল

Comments

comments

আরো দেখুন

এমন আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Scroll Up
Close

Send this to a friend