স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা

কিডনি সমস্যা অবহেলা করছেন না তো ?

অধ্যাপক ডা. আছিয়া খানম এমবিবিএস, এমডি কিডনি (মেডিসিন) বিশেষজ্ঞ
চেম্বার : ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল
কিডনি আমাদের শরীরের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। প্রত্যেক মানুষের শরীরে দুটি করে কিডনি থাকে। এর আকার খুব বড় নয় কিন্তু এর কাজ অনেক ব্যাপক।  যেমন— ০. কিডনি আমাদের শরীরের দূষিত পদার্থ বের করে। কিডনি অকেজো হলে শরীরে দূষিত পদার্থ জমে যায়, ফলে নানান উপসর্গ দেখা দেয়। ০. কিডনি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে যা শরীরের অন্যান্য ফাংশন নিয়ন্ত্রণ করে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, শরীরে রক্ত তৈরি করা। তাই কিডনি অকেজো হলে শরীরে রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং রক্তচাপ বাড়ে। ০. কিডনি আমাদের শরীরে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং ইলেকট্রোলাইট (ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম) এর সমতা রক্ষা করে। কিডনি কাজ না করলে পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায় যা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ।   কিডনির অসুখকে নীরব ঘাতক বলা হয়। চুপিসারে এই রোগ আপনার শরীরে বাসা বেঁধে ধ্বংস করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর মধ্যে কিডনি ডেমেজ ক্যান্সার, হার্ট অ্যাটাকের পর অবস্থান করছে। শুধু আমেরিকাতে প্রায় ২৬ মিলিয়ন মানুষ কিডনি সমস্যায় ভুগছেন।   কিডনি রোগ সাধারণত দুই প্রকার ১) একিউট কিডনি ইনজুরি (একেআই) ২) ক্রনিক কিডনি ডিজিস (সিকেডি) একিউট কিডনি ইনজুরি যেসব রোগী হঠাৎ করে কিডনি রোগে আক্রান্ত হন তাদের আমরা একিউট কিডনি ইনজুরি বলে থাকি। সময়মতো যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগের পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব। যেসব কারণে একিউট কিডনি ইনজুরি হয় তা হলো— ০. ডায়রিয়ার মাধ্যমে শরীরে পানিশূন্যতা। ০. কোনো কারণে শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। ০. সেপটিক শক। ০. ভলটারিন জাতীয় ব্যথার ওষুধ এবং ০. এমাইনোগ্লাইকোসাইড জাতীয় এন্টিবায়োটিক সেবন ইত্যাদি। ক্রনিক কিডনি ডিজিজ যেসব কিডনি রোগ ধীরে ধীরে (মাস বা বছরের মধ্যে) কিডনির ক্ষতি করে তাদের ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বলা হয়। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা গ্লোমের লোনেফ্রাইটিস থাকার কারণে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসায় রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। তবে, তাদের কিডনি পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না। একপর্যায়ে তাদের নিয়মিত ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজনের মাধ্যমে ভালো থাকতে হয়। এ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীরা পুরোপুরি সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন, যদিও চিকিৎসা একটু ব্যয়বহুল। আতঙ্কের বিষয় হলো বেশির ভাগ মানুষই জানেন না যে তারা কিডনি সমস্যায় ভুগছেন। যার ফলশ্রুতিতে সময়মতো চিকিৎসার অভাবে অকালে হারাতে হচ্ছে প্রাণ। কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখে বুঝে নিতে পারেন আপনার কিডনিটি ভালো আছে কিনা। যেমন— প্রস্রাবে সমস্যা : তুলনামূলকভাবে প্রস্রাব কম হওয়া কিডনি রোগের অন্যতম লক্ষণ। শুধু তাই নয়, রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগও কিডনি সমস্যার লক্ষণ। সাধারণত কিডনির ফিল্টার নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। প্রস্রাবে পরিবর্তন : কিডনি রোগের একটি বড় লক্ষণ হলো প্রস্রাবে পরিবর্তন হওয়া। কিডনির সমস্যা হলে প্রস্রাব বেশি হয় বা কম হয়। বিশেষত রাতে এই সমস্যা বাড়ে। প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়। অনেক সময় প্রস্রাবের বেগ অনুভব হলেও প্রস্রাব হয় না। প্রস্রাবে রক্ত : সুস্থ কিডনি শরীরের ভিতরে রক্তে থাকা বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের সঙ্গে বের করে দেয়। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রস্রাবের সঙ্গে ব্লাড সেল বের হয়। সাধারণত কিডনি পাথর, কিডনি ইনফেকশন হলে এই সমস্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া প্রস্রাবে অনেক বেশি ফেনা দেখা দিলে বুঝতে হবে, প্রস্রাবের সঙ্গে প্রোটিন বের হয়ে যাচ্ছে। প্রস্রাবে অ্যালবুমিন নামক প্রোটিনের উপস্থিতির জন্যই এমন হয়। প্রস্রাবের সময় ব্যথা : প্রস্রাবের সময় ব্যথা হওয়া কিডনি সমস্যার আরেকটি লক্ষণ। মূলত প্রস্রাবের সময় ব্যথা, জ্বালাপোড়া— এগুলো ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের লক্ষণ। এটি কিডনিতে ছড়িয়ে পড়লে জ্বর হয় এবং পিঠ ব্যথা করে। খাবারে অরুচি : বিভিন্ন কারণে খাবারে অরুচি হতে পারে। কিন্তু এটি ঘন ঘন খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব অবহেলা করবেন না। শরীরে বিষাক্ত পদার্থ উৎপাদন হওয়ার কারণে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। পায়ের গোড়ালি ও পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া : হঠাৎ করে পায়ের পাতা এবং গোড়ালি ফুলে যাওয়া কিডনি রোগের অন্যতম লক্ষণ। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে দেহে সোডিয়ামের পরিমাণ কমে যায়, এতে পায়ের পাতা, গোড়ালি ফুলে যায়। চোখের চারপাশ ফুলে যাওয়া : যখন কিডনি থেকে বেশি পরিমাণে প্রোটিন প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে যায়, তখন চোখের চারপাশ ফুলে যায়। তাই এই সমস্যাকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। শরীরে ফোলা ভাব : কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য এবং বাড়তি পানি বের করে দেয়। কিডনিতে রোগ হলে এই বাড়তি পানি বের হতে সমস্যা হয়। বাড়তি পানি শরীরে ফোলাভাব তৈরি করে। অনেক বেশি ক্লান্ত অনুভব হওয়া : কিডনির কার্যতা কমে গেলে রক্তে দূষিত এবং বিষাক্ত পদার্থ উত্পন্ন হয়। ফলে আপনি ক্লান্তি, দুর্বল অনুভব করেন। এমনকি কাজে মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। এ সময় রক্ত স্বল্পতা দেখা দিয়ে থাকে। এই লক্ষণগুলো দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিডনি পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ছোট অবহেলা কেড়ে নিতে পারে আপনার জীবন।

Comments

comments

আরো দেখুন

এমন আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Scroll Up
Close

Send this to a friend