কলসকাঠী জমিদার বাড়িঃ হারিয়ে যাওয়া অতীত

2617

দর্পণ রিপোর্ট : বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের বাকেরগঞ্জ উপজেলা সদরের নিভৃতে কলসকাঠী জমিদার বাড়ির অবস্থান। উপজেলা সদরের সাহেবগঞ্জ খেয়া পার হয়ে মোটর সাইকেল, রিকশা বা ভ্যান যোগে প্রায় ৩ কিঃ মিঃ দূরত্বে কলসকাঠী বাজার সংলগ্ন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছেই জমিদার বাড়িটি অবস্থিত।

কলসকাঠীর ইতিহাসঃ

কলসকাঠী একটি  প্রাচীন জনপদ।বাকেরগঞ্জ তৎকালীণ আওরঙ্গপুর পরগণার অন্তর্ভূক্ত ছিল। বস্তুত পক্ষে কলসকাঠীর ইতিহাস জমিদারীর ইতিহাস। ১৭০০ সালের গোড়ার দিকে জমিদা002র জানকি বল্লভ রায় চৌধুরী কলসকাঠী স্থাপন করেন। আগে এর নাম ছিল কলুসকাঠী; কুলসকাঠী অপভ্রশ কলসকাঠী। জানকী বল্লভ রায় চৌধুরী ছিলেন গারড়িয়ার জমিদার রামাকান্তের পুত্র।

জানকী বল্লভ রায় চৌধুরীরা ছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই রাম বল্লভ। জানকী বল্লভকে হত্যার চক্রান্ত করে রাম বল্লভ। জানকী বল্লভ তার বৌদির মাধ্যমে হাত্যার বিষয়টি জানতে পেরে রাতের আধারে গারুড়িয়া ত্যাগ করে মুর্শিদাবাদ চলে যান। সেখানে তিনি নাবাবের কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন এবং নবাব তাকে অরংপুর পরগনার জমিদার হিসেবে নিয়োগ করেন।

জমিদারী পেয়ে তিনি কলসকাঠীতে এসে বসতি স্থাপন করে। কলসকাঠীর তের জমিদার মূলত জানকী বল্লভের পরবর্তী বংশধর।তাঁর বংশধররা প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন। তাঁদের একজন বিশ্বেশ্বর রায় চৌধুরী এ বাড়িটি নির্মাণ করেন।জমিদার পরিবারের কিছু সদস্য পাকিস্তান আমলে ভারত চলে যান। জমিদার বাড়ির ধবংসস্তুপ কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনও টিকে আছে।

কলসকাঠীতে প্রথম গিয়েছিলাম ২০১০ সালে, এক বন্ধুর কাছে পুরনো ভাঙ্গা একটি জমিদার বাড়ির সন্ধান পাই। এর কিছুদিন পরেই আমরা চারজন রওনা দেই বাকেরগঞ্জের উদ্দেশ্যে। তখন আমাদের কাছে ছিলোনা কোন সঠিক তথ্য। শুধু জানতাম বাকেরগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড নেমে খেয়া পার হতে হবে। সেই অনুযায়ী খেয়া ঘাট যেয়ে ডিঙ্গি নৌকাতে নদী পার হলাম।004

এখন এখানে ট্রলার আছে, আগে শুধু ডিঙ্গি নৌকাই ছিল ভরসা। ওপারে যেয়ে লোকজনের কাছে যতই জমিদার বাড়ির অবস্থান জানতে চাই, কেউই কোন সঠিক তথ্য দিতে পারছিল না। অনেকে জানেই না, এখানে জমিদার বাড়ি আছে, শুধু চলতি পথে দেখেছে কিছু ভাঙ্গা বাড়ির অবস্থান।

যাই হোক, অনেক কষ্টে একটা ভ্যান ঠিক করে আমরা পৌছাই কলসকাঠীতে। প্রথমে ধারনা করেছিলাম হয়তো একটাই জমিদার বাড়ি, কিন্তু ভ্যান চালক বলছিল কয়েকটি পুরনো বাড়ির কথা। পুরো এলাকাটার ভিতরেই একটা পুরনো পুরনো গন্ধ আছে। আসলে নদীর খুব কাছে হওয়াতে ওই সময়ে এখানে প্রচুর বণিকরা আসতো।005

যার ফলে এখানে রীতিমত একটি শহর গড়ে উঠেছিল। মূল জমিদার বাড়িতে প্রবেশপথেই পরে পুরনো কিছু ভাঙ্গা মন্দির এবং সংস্কারের অভাবে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত কিছু বাড়ি। আমরা জমিদার বাড়ির দরজায় ভ্যান থেকে নামলাম। এখানে বড় একটি মন্দির আছে, আর আছে একটি বড় শিব মূর্তি। এখান থেকে একটি সরু রাস্তা চলে গেছে জমিদার বাড়ির দিকে। পাশেই রয়েছে শানবাঁধানো বড় একটি পুকুর।

জমিদার বাড়িটি বেশ বড়। ভিতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে অন্দরমহল এর দিকে। বাইরের অংশে ছোট ছোট খুপরি, যেখানে দেখলাম গোয়ালঘর করা হয়েছে। বোঝা গেল এখন এখানে মানুষ থাকে। ভিতরে ঢুকতেই ছোট একটি উঠান এবং এর সাথে সিঁড়িপথ উঠে গেছে উপরে। সিঁড়িপথের নিচে রয়েছে আরেকটি দরজা, যেটা দিয়ে বাড়ির মূল অংশে প্রবেশ করা যায়।

ভিতরে ঢুকতেই দেখা হল বাড়ির বর্তমান বসবাসকারীদের সাথে। তাঁদের অনুমতি নিয়ে ভিতরের অংশের কিছু ছবি তুললাম। বাড়িটি মুলত দোতালা। ছাদে দেখলাম কড়িকাঠের বর্গা।

প্রায় তিনশো বছরের বেশী সময় ধরে এই কাঠামো শক্ত ভিত হয়ে দাড়িয়ে আছে, কিন্তু এখন নিঃসন্দেহে সংস্কারের দাবি রাখে। বাড়ির মানুষজনের কাছে শুনছিলাম তাঁদের অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কথা, আবার সরকারীভাবেও এদিকে নেই কোন দৃষ্টি।

বলা হয় এখানে তের জমিদারের বাস ছিল। আমরা অন্য বাড়িগুলোর সন্ধানে বের হলাম। আসলে কলসকাঠীকে একটি পৃথক জমিদার বাড়ি না বলে, বলা যায় পূর্ণাঙ্গ একটি প্রাচীন শহর। অনেকটা সোনারগাঁওয়ের পানাম নগরের মতো। এখানে জমিদার বাড়িগুলো বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে। মূল জমিদার বাড়ি থেকে বের হয়ে পাশের আরেকটি পুরনো বাড়িতে গেলাম।এই বাড়িটিও দোতালা।

এখানে একটি হিন্দু পরিবার থাকে। তারা আমাদের যথেষ্টই আপ্যায়ন করলো। বাড়ির অন্দরমহল পর্যন্ত আমাদের দেখিয়ে আনল। এই বাড়িটিও সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ। সামনে একটি বড় উঠান এবং সাথে মন্দির। এই মন্দিরে দেখলাম শত বছরের পুরনো মূল্যবান কোষ্ঠীপাথরের মূর্তি। চুরির ভয়ে মন্দিরের ভিতরে দেবীর মূর্তিকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। 006

মন্দিরের সামনেই রয়েছে ছোট একটি বেদি। পুজোর সময় এখানে প্রাণী বলি দেয়া হয়। প্রতি বছরের নভেম্বরে-ডিসেম্বর মাসে এখানে হয় ঐতিহ্যবাহী জগদ্বাত্রী পূজা। সর্ববৃহৎ দূর্গা পূজায় কলসকাঠীতে তেমন আনন্দ-উৎসব না হলেও এ পূজা ঘিরে কলসকাঠী পরিণত হয় লাখো মানুষের মিলনমেলায়। দূর দুরান্তের গ্রাম-গঞ্জ থেকে এই পূজায় অংশ নিতে মানুষজন ছুটে আসে।

এখান থেকে বের হতেই চোখে পড়ল অন্য একটি পুরনো বাড়ি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। একটি প্রাচীন লোহার সিন্দুক অযত্নভাবে পরে আছে জঞ্জালের সাথে। স্থানীয়দের কাছে শুনলাম কিছু প্রভাবশালী মানুষের কারনে এই বাড়িগুলো আজ ধ্বংসের পথে। অথচ খুব সহজেই সংরক্ষণ করলে কলসকাঠী হতে পারত একটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান, যেখানে মানুষ স্বাদ পেত শতাধিক প্রাচীন এক পরিবেশের।

এখান থেকে বের হয়ে আমরা হাঁটতে থাকলাম গ্রামের আরও ভিতরে। পথে আরও কয়েকটি পুরনো আমলের বাড়ি চোখে পড়ল, যার অধিকাংশই এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। ফেরার সময় বেশ কয়েকটি মন্দির চোখে পড়ল। আমাদের সবারই খারাপ লাগছিলো, এতো সুন্দর একটা পুরাতাত্ত্বিক সম্পদ শুধু যত্ন এবং সংস্কারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ত অধিদপ্তর যদি এদিকে যথাযথ দৃষ্টি দেয়, তাহলে এখনো এই হারিয়ে যাওয়া অতীতকে রক্ষা করা সম্ভব।

কিভাবে যাবেনঃ

ঢাকা থেকে লঞ্চ বা বাসে করে বরিশাল যেতে হবে। বরিশালের রূপাতলী বাস স্ট্যান্ড থেকে বাকেরগঞ্জ এর বাস পাওয়া যায় প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর। সেখান থেকে রিকসা নিয়ে খেয়াঘাট যেয়ে নদী পার হতে হবে। তারপর ভ্যান বা রিকশা করে কলসকাঠী যাওয়া যাবে।

কোথায় থাকবেনঃ

থাকার জন্য বরিশালে ভালো ভালো কয়েকটি হোটেল আছে। যেমন- হোটেল এথেনা, হোটেল আলী, হোটেল ইস্টার্ন ইত্যাদি। এ ছাড়া যদি বাকেরগঞ্জ থাকতে চান তাহলে আগে থেকে অনুমতি নিয়ে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে থাকা যাবে। উপরি পাওনা হিসেবে বরিশাল শহরটাও ঘুরে দেখতে পারেন। ব্রজমোহন কলেজ, বিবির পুকুর, গুঠিয়া মসজিদ, দূর্গা সাগর এগুলো সবই বরিশালের ঐতিহ্যবাহী স্থান।

Comments

comments