করোনার লড়াইয়ে অদম্য নারী জিনাত সোহানা

0
0
সর্বমোট
0
শেয়ার

চট্টগ্রামের বহু মাদ্রাসায় ছুটে গিয়েছেন তিনি। সেই সংখ্যাটা কতো হবে— সেই হিসাব কি তার কাছেও আছে? হয়তো না। তবে পুরো চট্টগ্রামে খুব কম মাদ্রাসাই আছে, যেখানে এই নারীর পা পড়েনি। নিজের কন্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে হাজারও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে তিনি গাইতে উদ্বুদ্ধ করেছেন জাতীয় সংগীত। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠেও তার আয়োজনে ধ্বনিত হয়েছে— ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগান। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

তরুণ সংগঠক, রাজনীতিক ও আইনজীবী জিনাত সোহানা চৌধুরী এভাবে অনেকের কাছেই ‘আইকন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। স্বাভাবিক সময়ে রাজনীতির মাঠ চষে বেড়ানো এই নারী বসে ছিলেন না করোনার ঘোর দুর্যোগকালেও।

করোনার ভয়ে অনেকে যখন নিজেকে গুটিয়ে রাখেন চার দেয়ালের মাঝে, তখন তিনি করোনা রোগীদের সেবায় ছুটে বেড়িয়েছেন পথে-প্রান্তরে। নারী হয়েও ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে পুরুষের মতো যেকোনো দুঃসাহসিক কাজ করা যায়, সেটিই তিনি সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছেন।

‘অদম্য’ এই করোনা যোদ্ধা গত তিন মাসে সহস্রাধিক মানুষকে দিয়েছেন খাদ্য ও অর্থ সহায়তা। করোনায় মৃতদের দাফনকাফনে এগিয়ে আসা গাউছিয়া কমিটিকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্লোরিডার কাছ থেকে সংগ্রহ করে দিয়েছেন অ্যাম্বুলেন্স।

সমমনা কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন করোনা আইসোলেশন সেন্টার। যা পরে রূপ নেয় ট্রিটমেন্ট সেন্টারে। এজন্য তিনি ফান্ড সংগ্রহ করা, ডাক্তার ও নার্সদের বেতনের ব্যবস্থা করা, করোনার নমুনা সংগ্রহের বুথ স্থাপন, এক্স-রে মেশিন, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা জোগাড়েও ছিলেন সচেষ্ট। এই সেন্টারের প্রতি আস্থা রেখে সাড়ে পাঁচ শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। চট্টগ্রাম শুধু নয়, আশেপাশের জেলা থেকেও এসেছেন কেউ কেউ। এমন মায়া ছড়ানো আইসোলেশন সেন্টারটির মুখপাত্র জিনাত সোহানা চৌধুরী।

পরিবার, সংসার ও দুই শিশু সন্তানকে রেখে তিনি প্রতিদিনই ছুটে এসেছেন এই আইসোলেশন সেন্টারে। অফিসিয়াল কাজের পাশাপাশি করোনাভাইরাসের ভয়কে উপেক্ষা করে করোনা রোগীদের কাছে গিয়ে পরম মমতায় তাদের যাবতীয় বিষয়ের খবর নিয়েছেন, থেকেছেন পাশে।

করোনাকালে ‘সম্মুখযুদ্ধ’ শুরুর প্রস্তুতির কথা বলতে গিয়ে তরুণ আইনজীবী ও সুচিন্তা বাংলাদেশ চট্টগ্রামের সমন্বয়ক জিনাত সোহানা চৌধুরী চট্টগ্রাম প্রতিদিনকে বলেন, ‘মহামারী করোনাভাইরাস যখন দেশে প্রথম শনাক্ত হয়, তখন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংকট মোকাবেলায় সবাইকে কাজ করতে নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সৈনিক হয়ে তখন সেটা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছি আমি। ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি কয়েকজন তরুণকে নিয়ে নিজেরাই গড়ে তুলি করোনা আইসোলেশন সেন্টার। এই মহামারি যেহেতু সরকারের একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না, তাই তরুণদের সাথে নিয়ে কাঁধে কাধ মিলিয়ে কাজ শুরু করি।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম করোনার প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের ভর্তি না নেওয়ার অভিযোগ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা রোগী তো দূরের কথা, সাধারণ শ্বাসকষ্টের রোগীকেও ভর্তি না নেওয়ায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ আসতো প্রতিদিনই। সামান্য অক্সিজেনের অভাবে রোগী মারা যাচ্ছিল। করোনা ছিল একটা আতঙ্ক— যখন করোনা হলেই সন্তান ছেড়ে মা-বাবা চলে যাচ্ছে, মা-বাবাকে সন্তান রেখে আসছে গভীর জঙ্গলে। নিজের মা-বাবার সৎকারে সন্তানরা এগিয়ে আসছে না, আত্মীয়স্বজন ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে করোনা হলে। এত এত অভিযোগ শুনে দেশপ্রেম থেকে, দেশকে ভালোবেসে, দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমরা এগিয়ে আসি।’

কিন্তু পরিবারের পিছুটান থাকার পরও কিভাবে এমন দুর্যোগে এগিয়ে আসার সাহস পেলেন— এমন প্রশ্নে জিনাত সোহানা বলেন, ‘আমরা চিন্তা করলাম মৃত্যু তো একদিন আছেই। দেশের এই ক্রান্তিকালে যদি আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকি, তাহলে আমরা কখনো নিজের বিবেকের কাছে নিজেকে পরিষ্কার রাখতে পারবো না। তাই আমরা তরুণদের সাথে সম্পৃক্ত হই। আমরা চিন্তা করলাম, সম্পূর্ণ বিনামূল্যে একটা আইসোলেশন সেন্টার করবো— যেখান থেকে সাধারণ রোগীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ, খাবার থেকে শুরু করে সব ধরনের সেবা পাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইসোলেশন সেন্টারের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত আমি বিভিন্ন ধরনের কাজ করে যাচ্ছি। ডাক্তার, নার্সদের বেতনের ব্যবস্থা করা, তহবিল সংগ্রহ, জিনিসপত্র কেনা, করোনার নমুনা সংগ্রহের বুথ স্থাপন, এক্স-রে মেশিন, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলাসহ অন্যান্য সরঞ্জাম জোগাড় করতে সহযোগিতা করেছি।’

শুরুর দিকটা খুব একটা সুখকর ছিল না জানিয়ে জিনাত সোহানা বলেন, ‘যখন আমরা প্রথম উদ্যোগটা নিই, তখন চারদিকে ছিল শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। এ ক্ষেত্রে আমাদের কারও কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। নিজেদের মনোবল শক্ত রেখে শূন্য থেকে আমরা শুরু করি। প্রথম দিকে এই আইসোলেশন সেন্টার খুব উন্নত ছিল না। পরে সেবার মান বাড়াতে উদ্যোক্তারা সকাল-সন্ধ্যা মিটিং করি। প্রতিদিনই নিত্য নতুন সমস্যা সামনে আসতে থাকে। তবে সব বাধা মোকাবেলা করে ধীরে ধীরে বেড়েছে এই আইসোলেশন সেন্টারের সেবার মান ও সুযোগ সুবিধা। এতে চট্টগ্রামের বিত্তশালীদেরও যথাসাধ্য সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছি আমরা।’

তিন তিনবার চট্টগ্রাম কারাগারের বেসরকারি পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করা জিনাত সোহানা আরও বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে একজন তরুণ সংগঠক হিসেবে আমি চেষ্টা করেছি নিজেকে ব্যতিক্রমধর্মী ও চ্যালেঞ্জিং কাজগুলোতে সম্পৃক্ত রাখতে। নারী নয়, একজন মানুষ হিসেবেই বাসায় দুটি ছোট বাচ্চা রেখে নিয়মিত আইসোলেশন সেন্টারে ছুটে এসেছি। অফিসিয়াল কাজগুলো করা, করোনা রোগীদের সংস্পর্শে গিয়ে তাদের দেখাশোনা করা, তাদের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার খবর নেওয়া থেকে শুরু করে ডাক্তার, নার্স, স্বেচ্ছাসেবকদের মাঝে সমন্বয় করা, তাদের প্রশিক্ষিত করাসহ সব কিছুই করতে দ্বিধা করিনি।’

এই সংগঠক আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি এই বৈশ্বিক মহামারী মোকাবেলায় তরুণদেরই এগিয়ে আসা উচিত। আমরাই প্রথম বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে ১০০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার করেছি। পর্যায়ক্রমে এটা ট্রিটমেন্ট সেন্টারে রূপান্তরিত হয়। প্রতিদিনই অসংখ্য রোগী ইনডোর, আউটডোরে সেবা নিয়েছে। এটা আমাদের জন্য একটা বড় অর্জন।’

শত রকমের বাধা এসেছে জানিয়ে জিনাত সোহানা চৌধুরী বলেন, ‘কাজ করতে গিয়ে শত রকমের বাধা-বিপত্তি এসেছে। কিন্তু এতে এতটুকু থেমে যাইনি, একচুলও নড়ে যাইনি। নিজের অবস্থানে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। মানুষের জন্য কিছু করার মাঝে যে আনন্দ— তা দুনিয়াতে আর কিছুতেই নেই। চলার পথে মানুষের যে ভালোবাসা আর দোয়া পাচ্ছি তা আগামীতে এগিয়ে যাওয়ার পাথেয়।’ সূত্র: চট্টগ্রাম প্রতিদিন

0
0
সর্বমোট
0
শেয়ার

Comments

comments