
উচ্চ মূল্যস্ফীতির
কারণে এমনিতেই দিশাহারা মানুষ। প্রায় সব পণ্য ও সেবার খরচ বাড়ছে। আগের দিনের সঙ্গে
মিলছে না পরের দিনের বাজারদর। বছরে আয় যতটা বাড়ছে, ব্যয় বাড়ছে তার কয়েক গুণ। এমন পরিস্থিতির
মধ্যে মানুষ যখন আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন গ্রাহকপর্যায়ে আরেক দফা
বাড়ল বিদ্যুতের দাম। ৫ শতাংশ দাম বাড়িয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপন দিয়েছে সরকার।
গত ১৪ বছরে এ নিয়ে ১১ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো।
নতুন দাম কার্যকর
হবে চলতি মাস থেকেই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা হয়েছে-
আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি
৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বেড়ে ৩ টাকা ৯৪ পয়সা, শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীর বিদ্যুতের
দাম ৪ টাকা ১৯ পয়সা থেকে বেড়ে ৪ টাকা ৪০ পয়সা, ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ৫
টাকা ৭২ পয়সা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ১ পয়সা, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ব্যবহারকারীর ৬ টাকা থেকে
বেড়ে ৬ টাকা ৩০ পয়সা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিটের জন্য ৬ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ৬৬
পয়সা, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিটের জন্য ৯ টাকা ৯৪ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৪৫ পয়সা এবং ৬০০
ইউনিটের ওপরে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল ১১ টাকা ৪৯ পয়সা থেকে
বেড়ে ১২ টাকা ৩ পয়সা করা হয়েছে।
এর আগে গত ৮ জানুয়ারি
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন
কমিটি ভোক্তাপর্যায়ের খুচরা বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করে। সুপারিশে বিভিন্ন
বিদ্যুৎ কোম্পানির প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টার গড় মূল্য ৭ টাকা ১৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা
২৩ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২০ সালের
২৭ ফেব্রুয়ারি
গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ হারে বাড়ানো হয়।
এদিকে আবাসিক
গ্রাহক ছাড়াও বেড়েছে সব ধরনের বিদ্যুতের দাম। কৃষি, ধর্মীয়, দাতব্য, হাসপাতাল, রাস্তার
বাতি, পানির পাম্প, ক্ষুদ্র শিল্প, শিল্প, বাণিজ্য, ব্যাটারি চার্জিং স্টেশনের বিদ্যুতের
দাম বেড়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি
ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভর্তুকি
সমন্বয় করতে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন
অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান মনে করেন, বিদ্যুতের দাম যতটুকু বাড়ানো হয়েছে,
তা সহনীয়। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি সঠিক হয়নি।
সম্প্রতি অধ্যাদেশ
সংশোধন করে সরকার দাম নির্ধারণের ক্ষমতা নিজের হাতে নেয়। ওই সময় বলা হয়েছিল- জরুরি
প্রয়োজন ছাড়া এ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে না। কিন্তু বিইআরসির শুনানির চার দিনের মাথায়
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল সরকার।
এদিকে বিইআরসির
বিবেচনাধীন থাকাবস্থায় নির্বাহী আদেশে এভাবে তড়িঘড়ি করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘটনা
নজিরবিহীন। বিশেষ করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের বিবেচনাধীন থাকা বিদ্যুতের দাম নির্বাহী
আদেশে বাড়ানোর খবরে অনেকেই বিস্ময়
প্রকাশ করেছেন। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বৃদ্ধির আবেদনের ওপর ৮ জানুয়ারি শুনানি
গ্রহণ করে বিইআরসি। আইন অনুযায়ী শুনানিপরবর্তী সম্পূরক প্রস্তাবনা (যদি থাকে) দেওয়ার
জন্য ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়া ছিল। তার আগেই নির্বাহী আদেশে বাড়াল বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগ
সূত্রে জানা যায়, বিলিং মাস বা বিলিং সার্কেল হিসাব করে জানুয়ারি থেকেই নতুন দর কার্যকর করতে চায় বিদ্যুৎ
বিভাগ। ফলে দ্রুত নির্বাহী আদেশে দাম নির্ধারণ করা হলো। আরইবিসহ কোনো কোনো সংস্থা ১০
তারিখের মধ্যেই বিল তৈরির কাজ শুরু করে। সেসব গ্রাহকের বিল আদায়ে সমস্যা হতে পারে।
ফেব্রুয়ারির বিলের সঙ্গে জানুয়ারির বর্ধিত বিল আদায় করতে গেলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া
হতে পারে। এ কারণে ১৫ জানুয়ারির আগেই নতুন দামের ঘোষণা এলো।
বিইআরসি সূত্র
জানিয়েছে, তাদের দিক থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার কোনো সুযোগ
নেই। আইন অনুযায়ী শুনানির পর সম্পূরক প্রস্তাব (যদি থাকে) দেওয়ার জন্য ১৫ জানুয়ারি
পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ওই তারিখের আগে সিদ্ধান্ত দিতে চায় না বিইআরসি।
বিইআরসি গত ২১
নভেম্বর বিদ্যুতের পাইকারি দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতিইউনিট ৬ দশমিক ২০ টাকা
নির্ধারণ করে। তার পরেই বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন
জমা দেয়। শুনানিতে বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটি গড় ১৫ দমশিক ৪৩ শতাংশ দাম বাড়ানোর সুপারিশ
করে। বেশি ডিপিডিসির ১৬ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং সবচেয়ে কম আরইবির ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ দাম
বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে। গ্রাহকপর্যায়ে সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ দশমিক
৭৭ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়।
নিট পোশাক শিল্পমালিকদের
সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সরকার বিদ্যুতের
যে দাম বাড়িয়েছে, তা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে বলে আমরা মনে করি।’ তবে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে
যাবে বলে মনে করেন তিনি।
এতদিন গ্যাস ও
বিদ্যুতের দাম গণশুনানি করে দাম নির্ধারণ করত বিইআরসি। গত ১০ জানুয়ারি বিশেষ প্রেক্ষাপটে
বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম নির্ধারণ, পুনর্নির্ধারণ এবং সমন্বয়ে সরাসরি সরকারের
হস্তক্ষেপের সুযোগ রেখে ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন)
আইন ২০২৩’-এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
এর পর পরই বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপন জারি করে বিদ্যুতের দাম বাড়াল বিদ্যুৎ বিভাগ।
এর আগে গত ২৮
নভেম্বর ‘বাংলাদেশ এনার্জি
রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২২’-এর খসড়া চূড়ান্ত
অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। গত ১ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ এনার্জি
রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২২’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি
মো. আবদুল হামিদ। এ অধ্যাদেশবলে বিইআরসির পাশাপাশি সরকার চাইলেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির
দাম বাড়াতে বা কমাতে পারবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন সংশোধন করে সেখানে
ট্যারিফ নির্ধারণ, পুনর্নির্ধারণ বা সমন্বয়ে সরকারের ক্ষমতা শিরোনামে নতুন একটি ধারা
অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত
কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নিয়ে বিইআরসি এবং বিদ্যুৎ বিভাগে নানা খবর শোনা
যাচ্ছিল। গত ৮ জানুয়ারি বিইআরসি গণশুনানির আগে মন্ত্রণালয়ের মতামত নেয়। মন্ত্রণালয়
তখন বিইআরসিকে শুনানি করে দাম বৃদ্ধির অনুমোদন দেয়। কিন্তু ৮ জানুয়ারি শুনানির পর মন্ত্রণালয়
থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তখন বিইআরসি এই
পরামর্শ বাস্তবায়নে অপারগতা প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়কে জানায়, ১৫ জানুয়ারি শুনানিপরবর্তী
মতামত দেওয়ার সময় বেঁধে দিয়েছে তারা। এর আগে দাম বাড়ানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এদিকে তাড়াহুড়া
করে করে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হলো কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান
আব্দুল জলিল বলেন, আমরা সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই দাম পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া
শুরু করি। কিন্তু হঠৎ করে সরকার নির্বাহী আদেশে দাম বাড়িয়েছে। এটি সরকার করতেই পারে।
সে ক্ষেত্রে আমার কিছু বলার নেই।

