
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্বের অসংখ্য দেশ। বিশেষ করে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে নর্ড স্ট্রিম দিয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদি রাশিয়া সত্যিই গ্যাস বন্ধ করে দেয় তাহলে সংকটে পড়বে ইউরোপের দেশগুলো। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের জন্য এবার আফ্রিকামুখী হচ্ছে ইউরোপ।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারণার ওপর ভিত্তি করে রয়টার্সের পূর্বাভাস বলছে, আফ্রিকা মহাদেশে মোট ১০ হাজার কোটি ডলারের প্রকল্পে বিনিয়োগ হতে পারে। এ মুহূর্তে আফ্রিকার যে দেশগুলোতে জ্বালানি তেল বা গ্যাসের মজুদ রয়েছে, সেগুলোতেও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিপুল বিনিয়োগ আসতে যাচ্ছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে নামিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, উগান্ডা, কেনিয়া, মোজাম্বিক ও তানজানিয়া।
জ্বালানি খাতের দুজন বিশ্লেষকের মতে, কেবল নামিবিয়াই প্রতিদিন পাঁচ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলের জোগান দিতে সক্ষম। সম্প্রতি অনুসন্ধানে পাওয়া কূপগুলোর তথ্য বিশ্লেষক করে একথা জানিয়েছেন তারা।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রাক্কলন বলছে, পুরো আফ্রিকাতে যে পরিমাণ গ্যাস মজুদ আছে তা দিয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত রাশিয়া থেকে যে গ্যাস আসত তার এক-পঞ্চমাংশ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। প্যারিসভিত্তিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাটির মতে, সে সময়ের মধ্যে আফ্রিকার আরো তিন হাজার কোটি ঘন মিটার গ্যাস ইউরোপে প্রবাহিত করা সম্ভব।
নামিবিয়া উপকূলের ৩০ হাজার স্কয়ার কিলোমিটার অধিক্ষেত্রে তেল উত্তোলনের লাইসেন্সের বিষয়ে আগ্রহের কথা জানিয়েছে কানাডিয়ান অয়েল এক্সপ্লোরার ইকো আটলান্টিক অয়েল অ্যান্ড গ্যাস। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গিল হজম্যান বলেন, যেহেতু বিশ্বের দেশগুলো এখন রাশিয়ার জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বিকল্প খুঁজছে, তাই খাতসংশ্লিষ্টরা এখন আফ্রিকার দিকে মনোযোগী হয়েছে। আফ্রিকা সেক্ষেত্রে কী প্রস্তাব দেয় সেটিই দেখার বিষয়। তেল-গ্যাস খাতের সব বড় প্রতিষ্ঠানই এখন আফ্রিকা অঞ্চলে ক্ষেত্র অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদনের সুযোগ পেতে প্রতিযোগিতা শুরু করেছে।
রাশিয়ার তেল সরবরাহের ওপর ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা এবং রাশিয়ার গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেয়ার কারণে কিছু দেশে ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ অনুযায়ী গত মার্চে ব্যারেলপ্রতি জ্বালানির দাম পৌঁছেছিল ১৩৯ ডলারে, যা গত ১৫ বছরে সর্বোচ্চ। ২০১৪ সালের পর আফ্রিকার জ্বালানি খাত এখনো পুনরুজ্জীবিত হতে পারেনি। জুনে আইইএর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকা সরবরাহ সংকট সহজ করতে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল বলেন, আমরা প্রথমবারের মতো সত্যিকার বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে রয়েছি। রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের কারণে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে সেজন্য আমাদের অবশ্যই বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে।
গত মাসেই তানজানিয়ার সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বিষয়ে চুক্তি সই করেছে নরওয়ের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংস্থা ইকুইনর এবং যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান শেল। গত জানুয়ারিতে মোজাম্বিক সফর করে পরিস্থিতি দেখে এসেছে ফ্রান্সের তেল খাতের জায়ান্ট টোটাল এনার্জিস। যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঠিক থাকে তাহলে চলতি বছরই মোজাম্বিকে ২ হাজার কোটি ডলারের এলএনজি প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সব মিলিয়ে আফ্রিকাজুড়ে তেল ও গ্যাস খাতে বেশ বড় কর্মযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।
