
অভিনন্দন আর
ভালোবাসার বন্যায় সিক্ত তামান্না আক্তার নূরার আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
লেখাপড়া, অতঃপর বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার স্বপ্ন এখন তার
কাছে ধোঁয়াশা নয়, বরং সময়ের সিঁড়ি বয়ে চলার পথে একরাশ চ্যালেঞ্জ তার সামনে।
বঙ্গবন্ধুর
দুই তনয়ার হাত ধরে সেই চ্যালেঞ্জ লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে বলে দৃঢ়ভাবে প্রত্যয়ী অজেয় তামান্না।
বললেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা দু’জনই বলেছেন আমার স্বপ্নপূরণে পাশে
থাকবেন। তাদের ফোন পেয়ে তো আমিই কেঁদেই ফেলেছিলাম। তারা দু’জনেরই আমার জন্য অনেক অনেক সিমপ্যাথি।’
মঙ্গলবার (১৫
ফেব্রুয়ারি) সকালে প্রধানমন্ত্রীর পিএস কথা বলেন তামান্নার সাথে। তামান্না জানান, তিনি
দ্রুত আবেদন পাঠাতে বলেছেন।
এক পায়ের ওপর
ভর করে বেড়ে ওঠা জীবনে লেখাপড়ার নজিরবিহীন সাফল্যে তামান্না রীতিমতো ‘হিরো’ বনে গেছেন। পিএসসি থেকে এইচএসসি
পর্যন্ত প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় তিনি জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। অদম্য তামান্নার সাফল্যগাঁথা
নিয়ে ইত্তেফাক অনলাইনে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেলেন এক পায়ে লেখা সেই তামান্না শিরোনামে
এবং অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রচারের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা আলাদা আলাদাভাবে
তাকে ফোন করেন।
তামান্না জানান,
সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৫৬ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে হোয়াটসঅ্যাপে কল দেন।
এর আগে লন্ডন থেকে শেখ রেহেনাও কল করে কথা বলেন। সোমবার সন্ধ্যায় পড়াশোনার প্রস্তুতির
সময় হোয়াটসঅ্যাপ কল রিসিভ করতেই বললেন ‘আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছিলাম। আমি কি তামান্নার সাথে কথা বলছি?’ ফোনের কণ্ঠস্বর শুনে রীতিমতো ঘাবড়ে
যান তামান্না আক্তার নূরা। হয়ে পড়েন বাকরুদ্ধ। কাঁদতে থাকেন অঝোরে।
অভিনন্দন জানিয়ে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে কান্না থামাতে বলেন। ঘোড় কাটিয়ে বাস্তবে ফিরে এসে কান্না
থামিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সালাম দেন তামান্না। এ সময় তামান্না প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনার সাথে দেখা করার ইচ্ছা এবং তার স্বপ্ন পূরণে প্রধানমন্ত্রীকে পাশে চান।
প্রধানমন্ত্রী তার স্বপ্ন পূরণে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। বলেন বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টে
আবেদন করতে। এই ট্রাস্টের মাধ্যমের তাকে সবধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে তামান্নাকে
জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর সাথে তামান্নার টানা ৪ মিনিটের কথাপোকথনে
প্রধানমন্ত্রী তামান্নাকে একাধিকবার সাহস হারাতে নিষেধ করেন। বলেন ‘সাহস আর মনোবল থাকলে তুমি অনন্য
উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে।’
এর আগে বিকাল
সাড়ে ৪টায় তামান্নার হোয়াটসঅ্যাপে নাম্বারে ফোন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোটবোন
শেখ রেহেনা। ফোন রিসিভ করতেই তামান্না শোনেন, ‘আমি লন্ডন থেকে শেখ রেহেনা বলছি। আমি কি তামান্না নূরার সাথে কথা বলছি।
তখনই কান্না শুরু তামান্নার। এ সময় শেখ রেহেনা বলেন, কেঁদো না। টানা ভালো রেজাল্ট করায়
তোমাকে অভিনন্দন। তোমার সংগ্রামের কথা শুনেছি। তুমি খুব সাহসী। তুমি এগিয়ে যাও। আমরা
দুই বোন বেঁচে থাকা পর্যন্ত তোমাকে সহযোগিতা করে যাব। যারা সাহস রেখে চলে তারা কখনও
হেরে যায় না।’
প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা আর শেখ রেহেনার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পেরে দারুণ খুশি তামান্না। বলেন, প্রথমে
দুজনের সাথেই কথা বলতে গিয়ে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। প্রচণ্ড আবেগে থর থর করে কাঁপছিল আমার
ভেতরটা। মনে হচ্ছে আমার জীবনে সৃষ্টি হয়েছে ইতিহাস। এই অনভূতি আসলে ভাষায় বোঝানো যাবে
না। এতটাই আনন্দিত হয়েছিলাম যে, হাঁসতে পারিনি, কেঁদে ফেলেছিলাম। তবে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে
তার পিছনের গল্প শুনাতে চেয়েছিলাম। মনে হয় উনি ব্যস্ত থাকার কারণে বেশি কথা বলেননি।
তবে আমাকে নিয়মিত ভালোভাবে পড়াশোনা এবং নিজের যত্ন নিতে বলেছেন।
মঙ্গলবার সকালে
তামান্না বাবার সাথে গিয়েছিলেন যশোরের একটি প্রাইভেট থেকে চিকিৎসাধীন মায়ের ছাড়পত্র
নিয়ে ফেরার জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলে একাকি কীভাবে পড়ালেখা করবেন এমন প্রশ্নের
জবাবে তামান্না বলেন, ‘আমার সবকিছুই মা করেন। বোঝেনই তো প্রতিবন্ধী আমি। ঢাকায় পড়তে গেলে মাকে
সাথে লাগবে। মা গেলে ছোট দুটি ভাই-বোন কার কাছে থাকবে? ওদেরও যেতে হবে। মানে পুরো পরিবারকেই
যেতে হবে।’
এসব প্রধানমন্ত্রীকে
জানিয়েছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তামান্না জানান, না জানানো হয়নি। তবে আবেদন পাঠাতে
বলেছেন। সেখানে সবকিছু লিখব।
তামান্নার বাবা রওশন আলী বলেন, ‘গত ২৪ জানুয়ারি যশোরের জেলা প্রশাসকের
পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর চিঠি লিখেছেন তামান্না নূরা। চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীর
সঙ্গে দেখা করাসহ দুটি স্বপ্নের কথা জানিয়েছিলেন তামান্না। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে সোমবার
বিকাল ও সন্ধ্যায় পৃথক দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে অডিওকলে ফোন দিয়ে তামান্নাকে অভিনন্দন
জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহেনা। একইসাথে তারা দুই বোনই তামান্নার
স্বপ্নপূরণে যেকোনো সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তামান্নার লেখা চিঠি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা
হয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে
পাঠানো হয়। তামান্নার আঁকা বিভিন্ন ছবিও দেওয়া হয় ঐ চিঠির সাথে।’
তামান্নার বাবা
রওশন আলী আরও বলেন, ‘পরম করুণাময় আল্লাহর অসীম দয়ায় তামান্নার সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
ও তার বোন শেখ রেহেনা কথা বলেছেন। সবার দোয়ায় তামান্নার স্বপ্ন পূরণ হবে আশা করি।’
যশোরের ঝিকরগাছা
উপজেলার বাঁকড়া আলীপুর গ্রামের রওশন আলী ও খাদিজা পারভীন শিল্পী দম্পতির তিন সন্তানের
মধ্যে বড় তামান্না নূরা। তামান্না যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ডিগ্রি কলেজ থেকে
বিজ্ঞান বিভাগে এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। রবিবার প্রকাশিত ফলাফলে এসএসসির
মতো এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি।
এর আগে তামান্না ২০১৯ সালে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া জনাব আলী খান মাধ্যমিক
বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। একই ফল করেছিলেন পিইসি ও জেএসসিতেও।
বাবা রওশন আলী ঝিকরগাছা উপজেলার ছোট পৌদাউলিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার (ননএমপিও) শিক্ষক।
মা খাদিজা পারভীন গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তামান্না সবার বড়। ছোট বোন মুমতাহিনা
রশ্মি ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ভাই মুহিবুল্লা তাজ প্রথম শ্রেণির ছাত্র।

