
পটুয়াখালীর
রাঙ্গাবালী। অনেকটাই বিচ্ছিন্ন জনপদ। আরও দক্ষিণে গেলে সাগরের কোলঘেঁষে জাহাজমারা সৈকত।
রাঙ্গাবালী ঘাট থেকে ট্রলার, পরে মোটরসাইকেলে চেপে পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টা পার। পথে পথে
গ্রামীণ বাজার। কিছুদিন আগেও সন্ধ্যায় সূর্যের আলো নিভলে বাজারের দোকানে পর্দা নামতো
একযোগে। সেদিন ফেরার পথে রাত ১০টায়ও প্রায় সব দোকানই ছিল খোলা। অনেক দোকানে চলছিল টিভিতে
ক্রিকেট খেলা দেখার উন্মাদনা। গ্রামীণ বাজার হলেও আছে শহুরে ছোঁয়া। ফ্রিজ, টেলিভিশন,
ফ্যানের দোকানের দেখা মেলে বাজারে বাজারে। মাস কয়েক আগেও যা ছিল অকল্পনীয়।
ফজর আলী (৫৩)
বাজারের দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, 'বিজলি বাতি দেখেছি
সেই পটুয়াখালী শহরে। নিজের বাসা আর দোকানে বাতি জ্বলবে কখনও ভাবনায়ও আনিনি। এখনও স্বপ্নের
মতো লাগে।'
এভাবেই দেশের
গ্রাম, বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল, দুর্গম পাহাড় আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলের জীবন ও জীবিকা পাল্টে
গেছে বিদ্যুতের ছোঁয়ায়। এখন দেশের প্রতি আনাচে-কানাচে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। গ্রিড
বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব না হলে সৌর বিদ্যুতে আলোকিত হয়েছে সুবিধাবঞ্চিত জনপদগুলো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎসুবিধা পৌঁছেছে মুজিববর্ষেই।
আগামীকাল সোমবার এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন দেশের
শতভাগ এলাকা বিদ্যুৎসুবিধার আওতায়। শতভাগ বিদ্যুতায়নের সবচেয়ে বড় কাজটি করেছে বাংলাদেশ
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)।
আরইবির এক কর্মকর্তা
তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, 'আমরা কোথাও কোনো ছাড় দেওয়ার চেষ্টা করিনি। কোনো এলাকায়
একটি পরিবার বাস করলে তাকেও বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।' উদাহরণ টেনে তিনি
বলেন, 'গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় পিঞ্জরি এবং কুশলা দুটি গ্রামে মাত্র চারটি পরিবারের
বাস। ওই চার পরিবারে সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎসুবিধা পৌঁছে গেছে। যেখানে
যেভাবে বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব সেখানে সেভাবেই বিদ্যুৎ দিয়েছি। কোথাও সোলার হোম সিস্টেম,
কোথাও সাবমেরিন কেবল গিয়ে আমরা গ্রিড নিয়ে গেছি। আরইবি ছাড়ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যুৎ
বিতরণের দায়িত্বে থাকা ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং উত্তরাঞ্চলের
নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) কিছু দুর্গম এলাকার মানুষকে বিদ্যুৎ
পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছে।'
এ ব্যাপারে
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, '২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যে ইশতেহার
দিয়েছিল সেখানে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছিল। সরকার গরিব মধ্যবিত্ত
মেহনতী মানুষের জীবনের পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে। কোনো এলাকায় বিদ্যুৎ গেলে সেটি এই
খেটে খাওয়া শ্রেণির মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বড় প্রভাব ফেলে, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং তা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেছি।
এখন সাশ্রয়ীমূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে কাজ করছি। বেশ কিছু প্রকল্পে কাজ চলছে
সেগুলো শেষ হলে শহরের মতো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতের আরও উন্নত সেবা পাবে জনগণ।'
পাল্টে গেছে
জীবন ও জীবিকা: রাজশাহী শহর রক্ষা বাঁধে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ এক চর চরখিদিরপুর।
চরে আছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও। ভারত সীমান্ত লাগোয়া হাতেগোনা কিছু মানুষ এখানে বাস করেন।
তাদের প্রধান পেশা কৃষি। শহরের এত কাছে হলেও ছিল না বিদ্যুৎ। নর্দান ইলেকট্রিসিটি কোম্পানি
(নেসকো) এ এলাকার মানুষকে বিনামূল্যে সোলার হোম সিস্টেম বসিয়ে দিয়েছে। সেখানকার বাসিন্দা
রাহেলা বেগম বলছিলেন, কেরসিনের বাতি আর বিজলি বাতির তফাতের কথা। 'আগে সন্ধ্যার পর কোনো
কাজই করা যেত না। এখন চাইলে কাঁথা সেলাইয়ের কাজও করা যায়।' তিনি বলেন, 'আগে গরমের কারণে
ঘুমানো যেত না, সারারাত তালের পাখা টানতে হতো। এখন বৈদ্যুতিক পাখা লেগেছে।'
এভাবে প্রধানমন্ত্রীর
অগ্রাধিকার পাওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ১৯২টি প্রকল্প-গ্রামে পুনর্বাসিত
৮৫ হাজার ৫৭০টি ভূমিহীন, গৃহহীনদের পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
গ্রামের অর্থনীতি
চাঙ্গা: পিডিবির তথ্যমতে, ২০০৯ সালে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার ছিল ২২০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা।
বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের
(বিআইডিএস) গবেষণা বলছে, ১০ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লে অর্থনীতিতে বাড়তি যোগ হয়
চার কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিদ্যুতের ব্যবহার যত বাড়বে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি
তত বেশি হবে।
অর্থনীতিবিদ
মির্জ্জা এবিএম আজিজুল ইসলাম বলেন, গ্রামে বিদ্যুৎ যাওয়ায় জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে।
লেখাপড়ার সুযোগ বেড়েছে। ছোট ছোট শিল্প বিকশিত হচ্ছে। এতে প্রসারিত হচ্ছে অর্থনীতি।
জানা যায়, গ্রামাঞ্চলে
বিদ্যুতায়নের ফলে নতুন নতুন পোলট্রি খামার, মৎস্য খামার, ডেইরি খামার, ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প,
কল-কারখানা, কুটিরশিল্প, তাঁতশিল্প, ছোট-বড় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি গড়ে উঠছে।
আরইবি ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার ক্ষুদ্রশিল্প কারখানা, ১৩ হাজার ৫০০ মাঝারি শিল্প
কারখানা, ৩৭৫টি বৃহৎ শিল্প কারখানায় এবং ৮টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ
দিয়েছে। সংস্থাটি দাবি করেছে, এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
এতে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমছে, অন্যদিকে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। আরইবির
পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে বিদ্যুতায়িত শিল্পে অবিদ্যুতায়িত শিল্প অপেক্ষা ১১ গুণ
বেশি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
কৃষিতেও আধুনিকতা:
বর্তমানে তিন লাখ ৬০ হাজার সেচ গ্রাহকের মাঝে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আরইবি। এতে দেশের
প্রায় ৫৫ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে, যা খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে রাখছে
ভূমিকা। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের চেয়ে বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রে ১০ গুণ বেশি চাষাবাদ সম্ভব।
স্বাস্থ্যসেবা
বেড়েছে: গ্রামের অসহায়, গরিব, দুঃস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য স্থাপিত ১৪ হাজারের বেশি
কমিউনিটি ক্লিনিকের সবক'টিতেই আরইবি বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েছে। এতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য
সেবার মান বেড়েছে। কমেছে মৃত্যুঝুঁকি। গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্য সুবিধা বেড়েছে। এ ছাড়া,
সরকারি ও বেসরকারি ১৯৯৩টি হাসপাতালেও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
তথ্যসেবা হয়েছে
ডিজিটাল :গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ যাওয়ায় তথ্য ও সেবা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে জনগণের দোরগোড়ায়
পৌঁছেছে। ৪ হাজার ৫৫৪টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপিত ডিজিটাল ইনফরমেশন সেন্টারগুলোতে আধুনিক
ও সবশেষ তথ্য সেবা সহজে পাওয়া যাচ্ছে। এতে বেকার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ
সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষাতেও বিদ্যুতের
ঝলক: প্রায় ৫৬ হাজার ১৭২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ২ লাখ ৫১ হাজার ২৮৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে
বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও অন্যান্য আধুনিক
উপকরণ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার গুণগতমান
বাড়ছে।

