
ঈদের পর সাভারের
হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরীতে কর্মব্যস্ততা পুরোপুরি শুরু হয়নি। পাচার রোধ এবং বিশৃঙ্খলা
এড়াতে এবার ঢাকার বাইরে থেকে সাত দিন কোনো চামড়া ঢুকবে না বা ঢাকা থেকে বের হবে না।
সরকারের এ নিয়মের কারণে এ বছর ট্যানারিতে চামড়া কম এসেছে। এক কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের
লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ এসেছে ১৩৯টি ট্যানারিতে।
ট্যানারি মালিক
ও কর্মীরা জানান, ঈদের দিন ও ঈদের পরদিন কিছু মাদ্রাসা ও এতিমখানা থেকে ট্যানারিগুলো
সরাসরি চামড়া কিনেছে। দু'দিনেই লবণ মাখিয়ে প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত সম্পন্ন হয়েছে। এখন
কারখানাগুলোতে কাজের চাপ নেই। গতকাল বুধবার ট্যানারি ঘুরে কোথাও কর্মব্যস্ততা চোখে
পড়েনি।
কাজের ফাঁকে
ভুলুয়া ট্যানারির সামনে দোকানে চা খেতে এসেছিলেন অস্থায়ী কর্মী সাইদুর। তিনি বলেন,
ঈদ মৌসুমে ছুটা শ্রমিক লাগে চামড়ায় লবণ লাগাতে ও উল্টে দিতে। লবণ লাগাতে ট্যানারিগুলো
চামড়াপ্রতি ৩৫ টাকা এবং উল্টাতে ৫ টাকা দেয়। ঈদে সংগ্রহ করা চামড়ায় লবণ লাগানো শেষ।
এখন তেমন কাজ নেই।
ঈদের প্রথম
দু'দিনে এবারের লক্ষ্যমাত্রার কেউ ১০ শতাংশ কেউ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহ করেছেন।
আগামী সপ্তাহে হাজারীবাগ ও পোস্তার আড়ত থেকে চামড়া আসা শুরু হবে। তখন কাজের চাপ বাড়বে।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ
সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কিনা, তা যাচাই করতে সোমবার দুপুরে হেমায়েতপুরের হরিণধরায়
চামড়া শিল্পনগরী পরিদর্শন করেছেন শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা। তিনি সাংবাদিকদের জানান,
গত বছর ঢাকার বাইরে থেকে কোরবানির পশুর চামড়া ট্যানারিতে এলেও এবার আসতে পারেনি। চামড়া
পাচার বন্ধ করতে কোরবানির পর সাত দিন ঢাকার বাইরে থেকে কোনো চামড়া ট্যানারিতে না ঢোকানোর
এবং ঢাকা থেকে চামড়া বাইরে না নেওয়ার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। এসব কারণেই ট্যানারিগুলোতে
চামড়া সরবরাহ কম। তিনি জানান, নতুন ব্যবস্থার কারণে এবার চামড়া সবাই পেয়েছেন এবং যথাযথভাবে
লবণ লাগানো হয়েছে। জেলা প্রশাসকরা এটা তদারকি করেছেন। এ বছর লবণের দাম কিছুটা বাড়লেও
সরবরাহে ঘাটতি নেই। এবার চামড়া নিয়ে কোনো সিন্ডিকেট হয়নি বলেও দাবি তাঁর। বাংলাদেশ
ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, গত বছর প্রায়
৯০ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল। এবার এক কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে।
চামড়া পাচার রোধে সরকার নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। ট্যানারি মালিকরাও ন্যায্য মূল্যে চামড়া
কিনছেন।
চামড়া শিল্পনগরীর
নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে ১৩৯টিতে এবার চামড়া
আসছে। এ ছাড়া চামড়া সংরক্ষণে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ
সরবরাহসহ সব ধরনের সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি ড্রেন সংস্কার আর ট্রাকের বিশৃঙ্খলা এড়াতে
বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রপ্তানিমুখী
ভুলুয়া ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল আওয়াল জানান, এ বছর এক লাখ চামড়া
সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। এরই মধ্যে ৩০ হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছেন। ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসা
ও এতিমখানাগুলোই এগুলো সবরারাহ করেছে। তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পনগরীতে
ট্যানারি স্থানান্তর করার পাঁচ বছরেও পুরোপুরি পরিবেশসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি।
বর্জ্য পানি পরিশোধনের জন্য নির্মিত সিইটিপির ধারণ ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় কম। ট্যানারিগুলোকে
রেশনিং করে কাজ করতে বলা হয়েছে। এভাবে কাজ করলে প্রক্রিয়াজাত বিলম্বিত হবে, চামড়া নষ্ট
হবে। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যে ইয়ার্ড করা হয়েছে, তা অনেক ছোট বলেও অভিযোগ
তাঁর।
আনোয়ার ট্যানারির
পরিচালক দীন মোহাম্মদ জানান, এ বছর এক লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ঈদের
প্রথম দু'দিনে ১০ হাজার চামড়া সরাসরি মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা থেকে সংগ্রহ করেছেন।
১০-১৫ বর্গফুটের চামড়া ৭০০-৭৫০ টাকায়, ১৫-২৫ বর্গফুটের ৮০০-৮৫০ টাকায় এবং ৩০-৪০ ফুটের
চামড়া এক হাজার থেকে ১২শ টাকায়ও কিনেছেন।
সব ট্যানারি
এবার চামড়া সংগ্রহ করেনি। চামড়া শিল্পনগরীর নিউ কুমিল্লা ট্যানারির কর্মী সাফায়েত জানান,
বিক্রেতারা এসে হাজার টাকার ওপর দাম চেয়েছেন। এ কারণে কোনো চামড়া কেনা হয়নি। মধু হাজী
ট্যানারির কর্মী মো. মফিজ জানান, তাঁর ট্যানারির মালিক এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার চামড়া
সংগ্রহ করেছেন। এগুলোতে লবণ মাখিয়ে প্রাথমিক সংরক্ষণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি জানান,
চাইলেও বেশি চামড়া সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। কারণ ৪৫০ টাকার লবণের বস্তা ৯০০ থেকে হাজার
টাকায় উঠেছে। সব ধরনের কেমিক্যালের দাম ৩ থেকে ৫ গুন বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা
কম। হাজারীবাগে থাকাকালীন হোয়াইট ব্লু চামড়া অল্প খরচে প্রক্রিয়াজাত করে বেশি দাম পাওয়া
যেত। এখন খরচ বেড়েছে; কিন্তু চামড়ার দাম কমেছে।
এদিকে ট্যানারি
মালিকদের পাশাপাশি হেমায়েতপুরের আড়তদাররাও কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে বিভিন্ন শেডে মজুদ
করেছেন। এ বছর তাঁরা গরুর চামড়া ৭০০-৮০০ টাকা দরে কিনছেন ও ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ২০
টাকায় কিনছেন। বেশি দর পেতে চামড়া মজুত করে রাখছেন। দাম বাড়লে এগুলো ট্যানারি মালিকদের
কাছে বিক্রি করবেন।

