
বলা হয়, ভারতীয় সিনেমায় সংগীতের ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা হয় মণি রত্নম পরিচালিত রোজার মাধ্যমে। ৩৫ মিলিমিটার প্রিন্টে এমন এক আবেশ সৃষ্টি করেছিলেন তিনি যার রেশ রয়ে গেছে আজও। প্রেম, দ্রোহ আর নানা সংকটের গল্প নিয়ে সিনেমাটি এখনো প্রাসঙ্গিক। গল্প, সিনেমাটোগ্রাফি, অরবিন্দ স্বামী ও মধুর অভিনয়ের পাশে কাশ্মীরের প্রকৃতির উপস্থাপনা দর্শককে আবিষ্ট করে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সিনেমার অনবদ্য সংগীত। তামিল ভাষার রোমান্টিক থ্রিলার সিনেমাটির সংগীত পরিচালনা করেন এআর রহমান। প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমার সংগীত দিয়েই বাজিমাত করেন রহমান। সম্প্রতি ৩০ বছর পূর্ণ হলো সিনেমাটির। তিন দশক পরে এসেও রোজার গান, সংগীত সমানভাবে জনপ্রিয়। মণি রত্নমের একাদশতম সিনেমা রোজা। এর আগের ১০টি সিনেমায় বরাবরই সংগীত পরিচালকের ভূমিকায় ছিলেন ইলায়ারাজা। এ সিনেমায় রহমানকে নেয়া এবং অন্যান্য বিষয়ের পেছনে একটা গল্প আছে। রোজার প্রেক্ষাপট ভারতীয় মূলধারার সিনেমার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। মণি রত্নম জানতেন, এ কাজে ঝুঁকি অনিবার্য। কাজেই চূড়ান্ত লোকসান ঠেকাতে সীমিত বাজেট নির্ধারণ করা হয় রোজার জন্য। ভিন্ন ধরনের গল্পের সংগীত পরিচালনার জন্য নতুন মুখের সন্ধান করেন মণি রত্নম। এআর রহমান ছিলেন তার পূর্বপরিচিত। মণি ভাবলেন রহমানকে দিয়েই তার নতুন সিনেমার সংগীতের কাজ করানো যায়।
এর আগে ১৯৮৬ সালে মৌনা রাগাম সিনেমায় ইলায়ারাজার সংগীত পরিচালনায় কি-বোর্ড প্রোগ্রামিংয়ের কাজ করেছিলেন রহমান। ২৫ হাজার রুপির বিনিময়ে রোজা সিনেমার জন্য এআর রহমান চুক্তিবদ্ধ হন। অথচ মাত্র তিনদিন জিঙ্গেলের কাজ করেই এ অর্থ অনায়াসে আয় করা সম্ভব। কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমায় একক সংগীত পরিচালনার আগ্রহ এবং মণি রত্নমের সঙ্গে কাজ করার অভিপ্রায় থেকে রোজার প্রস্তাবে সাড়া দেন রহমান। মণি রত্নমের ভাষ্যমতে, ইলায়ারাজা ও এআর রহমানের কাজের ধরন সম্পূর্ণ বিপরীত। গানের মিক্সিং ও মাস্টারিংয়ের চূড়ান্ত পর্যায়েও নানা ধরনের পরিবর্তন করেন রহমান। প্রথম সিনেমাতেই নতুন নতুন এক্সপেরিমেন্ট করেন তিনি। সে সময় এআর রহমানের ব্যক্তিগত জীবনেও কিছু পরিবর্তন আসছিল। সবে এএস দিলীপ কুমার থেকে আল্লাহ রাখা রহমান নাম বরণ করেছেন। আধ্যাত্মিক কোনো জীবন হাতছানি দিচ্ছে তাকে। এদিকে রোজা সিনেমার জন্য বিসর্জন দিয়েছেন বার্কলে অব মিউজিকে পড়াশোনা করার সুযোগও। ব্যক্তিগত জীবনের উত্থান-পতন, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা গভীর ছাপ ফেলেছে রোজার সংগীতে। অন্যদিকে এ সিনেমায় মণি নিয়ে আসেন এমন একটি বিষয় যা মূলধারার ভারতীয় সিনেমায় আগে দেখা যায়নি। কাশ্মীর পরিস্থিতি এবং এর গভীর প্রভাবে যে ‘টেনশন’ ছিল তা মণি ধরতে চেয়েছেন আর সংগীতে সে টেনশনটি যেন জীবন্ত করে তুললেন এআর রহমান।
রোজা অ্যালবামের মোট ছয়টি গানে জ্যাজ, আফ্রিকান, ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক্যাল ও হিন্দুস্তানি সংগীতের ফিউশন করেন রহমান। রুকুমানি গানে ব্যবহার করেন জাপানি ড্রামস। রুকুমানি যেমন ছিল তালপ্রধান একটি পপ গান, তেমনি দিল হ্যায় ছোটা সা (তামিলচিন্না চিন্না আসাই) গানের সুর তুমুল শ্রোতাপ্রিয় হয়। পুরো অ্যালবাম রেকর্ডিংয়ের জন্য প্রথমে ডাক পড়ে অলকা ইয়াগনিক ও কুমার শানুর। অপরিচিত সংগীত পরিচালকের নাম শুনে প্রস্তাব নাকচ করে দেন দুজনই। পরে রহমানের সংগীত পরিচালনায় কণ্ঠস্বর দিলেও রোজার প্রস্তাব ফেরানোকে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুল বলে উল্লেখ করেছেন অলকা ইয়াগনিক। সিনেমাটি মুক্তির পর পরই স্রেফ গান ও সংগীতের জন্য ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। প্রাথমিকভাবে গানের লিরিক ও গায়ক-গায়িকার গায়কিতেই মনোযোগ দিয়েছিল দর্শক, কিন্তু রহমানের সুরের স্বাতন্ত্র্য ধরতে বেশি সময় লাগেনি। গানের সুর ও সংগীতায়োজনের পাশাপাশি ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও বাজিমাত করে। রোজা-ঋষির প্রেমে যেমন মিষ্টি আবহ তেমনি কাশ্মীরের সংকটও আবহ সংগীতে উঠে এসেছে। গানের ক্ষেত্রে শুধু ভারতেই এ অ্যালবামের তামিল ও হিন্দি সংস্করণ বিক্রি হয় ৩০ লাখ ইউনিট। ভারতের পরিসীমা অতিক্রম করে রোজার গান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে যায়। টাইম ম্যাগাজিনের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ১০টি সাউন্ডট্র্যাকে স্থান পায় রোজা অ্যালবাম। প্রথম সিনেমার জন্যই রহমানের ঝুলিতে ওঠে জাতীয় পুরস্কার। রোজা ছিল এক প্রবেশপথ। এর পর থেকেই ভারতীয় সিনেমাজগতের পথ খুলে যায় রহমানের জন্য।

