
চীনের কারখানা কার্যক্রমে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ডিসেম্বরে এ নিয়ে টানা তৃতীয় মাসের মতো দেশটির শিল্পোৎপাদন কার্যক্রম সংকুচিত হয়েছে। গত মাসে এ সংকোচনের হারও প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। হঠাৎ করে জিরো কোভিড নীতি থেকে বেরিয়ে এসেও সংকটের মুখোমুখি হয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনা সংক্রমণ উৎপাদন কার্যক্রমকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চীনের পরিসংখ্যান অফিস ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস (এনবিএস) জানিয়েছে, সরকারি ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) ডিসেম্বরে ৪৭ পয়েন্টে নেমেছে। নভেম্বরেও এ হার ৪৮ পয়েন্ট ছিল। এর আগে দুই মাস সংকোচনের পর সেপ্টেম্বরে ইতিবাচক অবস্থানে ফিরেছিল দেশটির শিল্পোৎপাদনের এ সূচক। এরপর আবারো তা নেতিবাচক অবস্থানে চলে গেছে। গত মাসে চীনের উৎপাদন খাতের এ সংকোচন অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়ে তীব্র ছিল। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা এটি ৪৮ পয়েন্টে অপরিবর্তিত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। পিএমআই ৫০ পয়েন্টের নিচে সংকোচন এবং এর ওপরে প্রসারিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
ডিসেম্বরের শুরুর দিকে কঠোর জিরো কোভিড নীতি থেকে হঠাৎ সরে আসার ঘোষণা দেয় বেইজিং। পাশাপাশি প্রায় তিন বছর ধরে চালিয়ে আসা গণপরীক্ষা কার্যক্রমও বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি। এ অবস্থায় নতুন শনাক্ত চিহ্নিত করার পদক্ষেপও থমকে গেছে। লকডাউন ও বিধিনিষেধ তুলে দেয়ায় দেশটির ব্যবসায়িক পরিস্থিতি উন্নত হওয়ার আশা করা হয়েছিল। তবে এর পরই দেশটিতে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রমণ। কিছু অনুমান বলছে, বর্তমানে দেশটিতে দ্রুত কোভিড সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে চীনের ১৪০ কোটি জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাস্থ্য তথ্য সংস্থা এয়ারফিনিটির তথ্য অনুসারে, ডিসেম্বরে ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ সম্ভবত ১ কোটি ৮৬ লাখে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ সাময়িকভাবে শ্রম ঘাটতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধও করা হয়েছিল। যেমন ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে সাংহাইয়ের কারখানা বন্ধ রেখেছিল টেসলা। মার্কিন বিদ্যুৎচালিত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি চলতি মাসেও গাড়ি উৎপাদন কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি হ্রাসকৃত উৎপাদন সময়সূচি চালিয়ে যাওয়া হবে।
বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি এরই মধ্যে চাহিদা দুর্বল করে দিয়েছে। এ পরিস্থিতি চীনের রফতানিকে আরো কমিয়ে দিতে পারে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশটির বিশাল উৎপাদন খাত। বাধাগ্রস্ত হবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। সরবরাহ ব্যবস্থাবিষয়ক একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টাইডালওয়েভ সলিউশনের একজন অংশীদার ক্যামেরন জনসন বলেন, বেশির ভাগ কারখানায় ক্রয়াদেশ কমে গেছে। সুতরাং চীনে বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হলেও উৎপাদন খাত ধীর হয়ে যাচ্ছে। কারণ বাকি বিশ্বের অর্থনীতি ধীর হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এমন যে কারখানায় শ্রমিক থাকবে কিন্তু তাদের হাতে কোনো ক্রয়াদেশ থাকবে না।
এনবিএস জানিয়েছে, উৎপাদন খাতের ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান করোনা সংক্রমণের কারণে ডিসেম্বরে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের এ হার আগের মাসের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। তবে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান আশা করছে, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হবে। গত সপ্তাহে দেশটির ব্যাংকিং ও বীমা নিয়ন্ত্রক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্যাটারিং ও পর্যটন খাতের ছোট এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় আর্থিক সহায়তা বাড়ানো হবে। বিশেষ করে মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘুরে দাঁড়াতে এ সহায়তা দেয়া হবে।
এদিকে উৎপাদন খাতের পাশাপাশি চীনের পরিষেবা কার্যক্রমেও বড় ধরনের পতন হয়েছে। এনবিএসের তথ্য অনুসারে, পরিষেবা খাতের পিএমআই ডিসেম্বরে ৪১ দশমিক ৬ পয়েন্টে নেমেছে। নভেম্বরে এ সূচক ৪৬ দশমিক ৭ পয়েন্টে ছিল। গত মাসের পিএমআই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন। এছাড়া উৎপাদন ও পরিষেবা খাত অন্তর্ভুক্ত থাকা সরকারি কম্পোজিট পিএমআই নভেম্বরের ৪৭ দশমিক ১ থেকে কমে ডিসেম্বরে ৪২ দশমিক ৬ পয়েন্টে নেমেছে।
অর্থনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান এশীয় অর্থনীতিবিদ মার্ক উইলিয়ামস বলেন, ইংরেজি নববর্ষের আগের সপ্তাহগুলো চীনের পরিষেবা খাতের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ ধারণা করা হচ্ছে, লোকেরা সংক্রমণের ভয়ে বাড়ির বাইরে যেতে এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যয় করতে অনাগ্রহী ছিল। তবে নববর্ষের ছুটিতে এ পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়া উচিত।

