ঝগড়া করার বিষয়ে ইসলামের নির্দেশ

প্রকাশিত:বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০২০ |
হালনাগাদ:শুক্রবার ১৫ জানুয়ারী ২০২১ |
৬১জন দেখেছেন


নিউজ পোস্ট ডেস্ক

কোরআন ও হাদিস অনুসারে, মুসলমানদের ঝগড়া করার বিষয়টি নিন্দনীয়। মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধ, ঝগড়া ও অসন্তোষ আল্লাহ তায়ালার রাগ বাড়িয়ে দেয়।

এক হাদিসে নবী করিম (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বলেন, আমি কি তোমাদেরকে এমন জিনিস বলে দেব না, যা নামাজ, রোজা ও সদকা প্রদানের চেয়েও উত্তম? এরপর তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে সন্ধি করানো। কারণ পারস্পরিক ঝগড়া দ্বীনকে শেষ করে দেয়।

বুযুর্গানে দ্বীন বলেন, পারস্পরিক ঝগড়া-বিদ্বেষ ও শত্রুতা মানুষের ভেতরকে এত নষ্ট করে যা অন্য কিছুতে করে না। মানুষ যদি নামাজ,  রোজা, তাসবীহ, ওযীফা ও নফল নামাজও আদায় করে, সঙ্গে সঙ্গে ঝগড়াও করে, এ ঝগড়া তার ভেতরকে নষ্ট করে দেবে।

তার ভেতর ফোকলা করে দেবে। কারণ ঝগড়ার ফলে মানুষের ভেতরে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। বিদ্বেষের বৈশিষ্ট্য হলো-মানুষকে ন্যায়ের উপর থাকতে দেয় না। ফলে সে অন্যের উপর কখনো হাতে, কখনো মুখে জুলুম করে, কখনো অন্যের মাল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্ট করে।

সহীহ মুসলিম শরিফের এক হাদিসে বী করিম (সা.) ইরশাদ করেন- প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার সমস্ত মানুষের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় এবং বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হয়। সর্বদাই তো সমস্ত মানুষের আমল আল্লাহ তায়ালার সামনে থাকে। আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক ব্যক্তির আমল সম্পর্কে অবহিত। এমন কি অন্তরের ভেদ সম্পর্কেও অবগত- কার অন্তরে কি কল্পনা আসে।

প্রশ্ন হয় আল্লাহর দরবারে আমল পেশ করা হয় এ হাদিসের অর্থ কী? উত্তর হলো- আল্লাহ তায়ালা সবকিছু জানেন, এ কথা তো ঠিক আছে। তবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাজত্বে এরূপ নিয়ম বানিয়ে রেখেছেন যে, ওই দুই দিন মানুষের আমল পেশ করা হয় যাতে পেশকৃত আমলের ভিত্তিতে তাদের বেহেশতি বা দোযখি হওয়ার ফয়সালা করা যায়।

আমল পেশ হওয়ার পর যখন কোনো মানুষের ব্যাপারে জানা যায়- এ ব্যক্তি এ সপ্তাহে ঈমানের সঙ্গে থেকেছে, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক সাব্যস্ত করেনি, আল্লাহ তায়ালা তার ব্যাপারে বলেন- আমি আজকে তার ক্ষমার ঘোষণা দিচ্ছি, অর্থাৎ এ ব্যক্তি সর্বদা জাহান্নামে থাকবে না। কোনো না কোনোদিন বেহেশতে সে প্রবেশ করবে। তার জন্য বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হবে।

তবে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা এ ঘোষণা করবেন- যে দুই ব্যক্তির মাঝে বিদ্বেষ ও শত্রুতা থাকবে তাদেরকে আটকে দেয়া হবে। তাদের বেহেশতি হওয়ার সিদ্ধান্ত আমি এখনই করছি না। যে পর্যন্ত তাদের উভয়ের মধ্যে সন্ধি না হবে।

১. যার অন্তরে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা ও শত্রুতা আছে। যে রাতে আল্লাহ তায়ালার রহমতের দরজা উন্মোক্ত থাকবে, রহমতের বাতাস বইতে থাকবে, সে রাতেও ওই ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকবে।

২. ওই ব্যক্তি যার টাখনুর নিচে পায়াজামা ঝুলে থাকে, তাকেও ক্ষমা করা হবে না

হিংসা থেকেই বিদ্বেষের জন্ম হয়। অন্তরে প্রথমে অন্যের প্রতি হিংসা জন্মে যে, সে আগে বেড়ে যাচ্ছে আর আমি পিছনে রয়ে যাচ্ছি। তার আগে বেড়ে যাওয়ার কারণে অন্তরে জ্বলন ও দুঃখ হচ্ছে। নেমে আসছে পতন। অন্তরে এ কামনা জাগে-আমি কোনোভাবে তার ক্ষতি সাধন করি, কারো ক্ষতি সাধন করা তো ক্ষমতার বাইরে।

ফলে যে পতন সৃষ্টি হচ্ছে তা থেকে মানুষের অন্তরে বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। অতএব বিদ্বেষ থেকে বাঁচার প্রথম উপায় হলো, প্রথমে নিজ অন্তর থেকে হিংসা শেষ করবে। বুযুর্গানে দ্বীন হিংসা দূর করার উপায় বর্ণনা করেছেন। যদি কারো অন্তরে হিংসা সৃষ্টি হয়-সে আমার আগে বেড়ে গেল কেন? এ হিংসার চিকিৎসা হলো- সে ওই ব্যক্তির জন্য দোয়া করবে, হে আল্লাহ! তুমি তাকে আরো উন্নতি দাও। তার জন্য এ দোয়া করার সময় তো অন্তরে ছুরি চলবে।

তার ব্যাপারে অন্তর চাচ্ছে- তার উন্নতি না হোক বরং ক্ষতি হোক, তবে মুখে এ দোয়া করছে, হে আল্লাহ! তাকে উন্নতি দান কর। অন্তরে ছুরি চললেও মনের উপর জোর দিয়ে এ দোয়া করছে। হিংসা দূর করার উত্তম চিকিৎসা হলো এটা। হিংসা যখন দূর হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ বিদ্বেষও দূর হয়ে যাবে। অতএব প্রত্যেক ব্যক্তি তার অন্তরে অনুসন্ধান করে দেখুক, যার ব্যাপারে অন্তরে বিদ্বেষ বা হিংসা কল্পনায় আসে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর এ দোয়া করবে। এটা হিংসা বিদ্বেষ দূর করার উত্তম চিকিৎসা।

মক্কার মুশরিকরা রাসূল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের উপর জুলুম করা এবং তাকে কষ্ট দেয়ার কোনো পন্থাই বাদ রাখেনি। এমন কি তার রক্ত পিয়াসি হয়ে গেল। ঘোষণা করে দিয়েছে- যে ব্যক্তি রাসূল (সা.)-কে ধরে নিয়ে আসতে পারবে, তাকে ১০০ উট পুরুষ্কার দেয়া হবে। ওহুদ যুদ্ধের সময় তাঁর উপর তীর-বৃষ্টি বর্ষণ করেছে। চেহারা মোবারক আহত হয়েছে। দন্ত মোবারক শহীদ হয়েছে। তবে তখনও রাসূল (সা.) এর মুখে এ দোয়া ছিল-হে আল্লাহ! আমার সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন, তারা জানে না, অনবহিত, মূর্খ, আমার কথা বোঝে না, এই জন্য আমার উপর জুলুম করছে।

একটু চিন্তা করুন, তারা জালেম ছিল, তাদের জুলুমে কোনো সন্দেহ ছিল না। তা সত্তে ও নবী করিম (সা.) এর অন্তরে তাদের প্রতি হিংসা বিদ্বেষের উদয় হয়নি। এটাও নবী করিম (সা.) এর মহান সুন্নত ও আদর্শ-অকল্যাণকামীর বদলা অকল্যাণকামনা দিয়ে দেবে না। বরং তার জন্য দোয়া করবে। এটাই হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করার উত্তম চিকিৎসা।

সুতরাং আমি নিবেদন করছি- পারস্পরিক ঝগড়ার ফলে অন্তরে হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়। ঝগড়া যখন প্রলম্বিত হয়, অন্তরে বিদ্বেষ অবশ্যই সৃষ্টি হবে। তখন অন্তর জগত ধ্বংস হয়ে যাবে। এর ফলে মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। এই জন্য শরীয়তের নির্দেশ হলো, পরস্পর ঝগড়া থেকে বেঁচে থাক এবং তা থেকে দূরে থাক।

ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, এক ঝগড়া তো শারীরিক, যাতে হাত পা ব্যবহৃত হয়। আরেক ঝগড়া হয় শিক্ষিতদের, আলেমদের। তা হলো আলোচনা পর্যালোচনা ও তর্ক-বিতর্ক। এক আলেম একটি বক্তব্য পেশ করেছে, অন্যজন তার বিপরীত বক্তব্য পেশ করেছে। সে একটি প্রমাণ দিয়েছে অন্যজন জবাব লিখেছে।

প্রশ্ন-উত্তর এবং আপত্তি ও খণ্ডনের এক অনন্ত ধারা চলতে থাকে। বুযুর্গানে দ্বীন একে কখনো পছন্দ করেননি। কারণ এর দ্বারা আভ্যন্তরীণ নূর দূর হয়ে যায়। ইমাম মালেক (রহ.) এটাই বলেছেন- ইলমি ঝগড়া ইলমের আলো দূর করে দেয়।

তবে মুযাকারা বা পারস্পকি আলোচনা, যথা একজন আলেম একটি মাসআলা পেশ করেছে। অন্য আলেম এ মাসআলায় আপত্তি উত্থাপন করেছে। এখন উভয়ে বসে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার মাধ্যমে এ মাসআলার সমাধান করতে লেগে যাওয়া-ই হলো মুযাকারা। এটা ভালো ও প্রশংসনীয় কাজ।

তবে একজন আলেম অন্য আলেমের বিরুদ্ধে বিবৃতি প্রকাশ করে, কোনো লিফলেট বা কোনো পুস্তিকা প্রকাশ করে, আর এ ধারা চলতে থাকে অথবা এক আলেম অন্যজনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয় এবং অন্যজন তার বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রদান করে। এভাবে পরস্পরের বিরোধিতার ধারা চলতে থাকে। এটা হলো মুজাদালাহ বা ঝগড়া যাকে আমাদের বুযুর্গানে দ্বীন ও আয়িম্মায়ে দ্বীন একেবারেই পছন্দ করেননি।

এক হাদিসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, যে সত্যের উপর থেকেও ঝগড়া পরিহার করে, তার জন্য বেহেশতের মধ্যভাগে একটি প্রাসাদ নির্মান করা হবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি সত্যের উপর থেকে চিন্তা করে- যদি আমি আমার অধিকার চাই, ঝগড়া সৃষ্টি হবে, তাই আমার পাওনা ছেড়ে দিলাম যেন ঝগড়া না হয়। তার ব্যাপারে রাসূল (সা.) বলেছেন, আমি তাকে বেহেশতের মধ্যভাগে প্রবেশ করানোর জিম্মাদার।

এর দ্বারা প্রতীয়মান হয়, রাসূল (সা.) পারস্পরিক ঝগড়া অবসানের কত চিন্তা করেছেন। তবে হ্যাঁ, কোথাও যদি বিষয়টা অনেক আগে বেড়ে যায়, সহ্যের বাইরে চলে যায়, তখন মজলুম কর্তৃক জালেমকে প্রতিহত করা এবং তার থেকে প্রতিশোধ নেয়ারও অনুমতি আছে। তবে যথাসম্ভব চেষ্টা করবে যেন ঝগড়া শেষ হয়ে যায়।