
লিজ ট্রাস ডাউনিং স্ট্রিটে পা রাখার মাত্র ছয় সপ্তাহ পার করতেই মনে হচ্ছে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। এখন তিনি আর কত দিন দল ও দেশের নেতৃত্বে থাকতে পারবেন, সেটা নিয়েই একধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। তবে তিনি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন দল কনজারভেটিভ পার্টিকে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত নেতৃত্ব দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। আগামী দুই বছরের মধ্যে যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এখন ট্রাস নিজেই এক ধরনের অস্তিত্বের লড়াইয়ের মুখে পড়েছেন।
কনজারভেটিভ পার্টির নেতার পদটি গত কয়েক বছর ধরে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে আসার (ব্রেক্সিট) পক্ষে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকেরা মত দিলে তখনকার প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন। তার উত্তরসূরি হিসেবে থেরেসা মে এবং বরিস জনসন— কেউই প্রত্যাশিত সময় ধরে দল ও সরকারের হাল ধরে রাখতে পারেননি। এখন লিজ ট্রাসের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই পুনরাবৃদ্ধি ঘটতে চলেছে। এমন ঘটলে সে ক্ষেত্রে ট্রাসের উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়েও গুঞ্জন শুরু হয়েছে। আর এই আলোচনায় ঋষি সানাকের নামটা প্রথমেই এসে যায়। মাস দেড়েক আগে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচনে লিজ ট্রাসের সঙ্গে ঋষি সানাক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে ট্রাস সহজেই ওই লড়াইয়ে জয়ী হন। কর ছাড়ের প্রতিশ্রুতি আর সরকারি খরচ না কমিয়েই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নীতিমালা প্রণয়নের অঙ্গীকার করে তিনি দলীয় সদস্যদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন।
৪২ বছর বয়সী ঋষি সানাক আগেই সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, বাড়তি ঋণ নেয়ার মাধ্যমে প্রস্তাবিত আর্থিক নীতিমালা বাস্তবায়নের যে পরিকল্পনা ট্রাস করেছেন, সেটা যুক্তরাজ্যে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে। প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী সানাকের কথা এখন পুরোপুরি সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। আর তাই ট্রাস তার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। বেকায়দা অবস্থা কাটিয়ে উঠতে তিনি কোয়াসি কোয়ার্টেংকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। আর সেই পদে জেরেমি হান্টকে নিয়োগ দিয়েছেন।
ট্রাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় প্রথম দফায় দলীয় আইনপ্রণেতারা সানাকের পক্ষেই বেশি সমর্থন দিয়েছিলেন। এখনো দলে তার উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা আছে যাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ট্রাসের বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। তবে সমস্যা হলো, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ঋষি সানাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। আর সে কারণে দলীয় সদস্যদের অনেকে সানাককে অপছন্দ করেন। হয়তো এ কারণে কনজারভেটিভ পার্টির শীর্ষ নেতা কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে ফের পিছিয়ে পড়তে পারেন। সে ক্ষেত্রে জেরেমি হান্ট অথবা পেনি মরডন্টের জন্য সম্ভবনার দুয়ার খুলে যেতে পারে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস বুধবার পার্লামেন্টে আইনপ্রণেতাদের সামনে বক্তব্য দেন। কর ছাড়ের আর্থিক পরিকল্পনা থেকে সরে আসার পর এটিই পার্লামেন্টে তার প্রথম ভাষণ। খুব স্বাভাবিকভাবে তিনি নিজ দলের পাশাপাশি বিরোধীদল লেবার পার্টির আইনপ্রণেতাদের কাছ থেকে বিভিন্ন কড়া প্রশ্নের মুখোমুখি হন। নতুন অর্থমন্ত্রী জেরেমি হান্ট সরকারের নতুন আর্থিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এটি সদ্য বিদায়ী অর্থমন্ত্রী কোয়ার্টেংয়ের প্রস্তাবিত মিনি বাজেটের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। কিন্তু এতে লিজ ট্রাস নেতৃত্বের প্রশ্নে আপাতত উতরে যেতে পারবেন কি না নিশ্চিত নয়। কারণ, কনজারভেটিভ পার্টির অন্তত পাঁচ নেতা ট্রাসকে সরিয়ে অন্য কাউকে নেতৃত্বে বসানোর কথা বলেছেন। একাধিক জনমত জরিপ অনুযায়ী ট্রাসের অবস্থান বা জনপ্রিয়তা ক্রমশ নিম্নমুখী। এমনকি দলের ভেতরেও যারা তাকে দিই মাসের কম সময় আগে ভোট দিয়ে শীর্ষ নেতা নির্বাচিত করেছিলেন, তাদের বেশির ভাগ এখন ট্রাসের বিদায় চাইছেন।
বিরোধীদল লেবার পার্টি চায়, লিজ ট্রাস ক্ষমতা ছেড়ে আগাম নির্বাচন দিয়ে দেবেন। দলটির শীর্ষ নেতা কেইর স্টার্মার বলেন, এভাবে চলতে পারে না। জনগণের মুখ বন্ধ রাখা যায় না। এই সরকারকে বহাল রাখার বিপদ এখন অনেকেই আঁচ করতে পারছেন। কনজারভেটিভ পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার এক বছরের মধ্যে ট্রাসের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট ডাকা যাবে না। তবে দলের অধিকাংশ আইনপ্রণেতা প্রয়োজনে গঠনতন্ত্র বদলে সেই উদ্যোগও নিতে পারেন। কিন্তু সে জন্য আগে ট্রাসের উপযুক্ত বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। আর সেটা খুব সহজ কাজ নয়।

