
গত ৩ জুন মিয়ানমারের
জান্তা সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, তারা অং সান সু চির দলের সাবেক এক সংসদ ও এক গণতন্ত্রপন্থী
কর্মীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে। ওই দুই ব্যক্তিকে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত
করা হয়েছে।
জান্তার মুখপাত্র
জ মিন তুন জানিয়েছেন, সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য ফায়ো জেয়া থ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকর্মী
কো জিমিসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোট চারজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করা হবে। মৃত্যুদণ্ড
কার্যকর হলে এটা হবে ১৯৮৮ সালের পর মিয়ানমারে বিচার বিভাগীয় ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের
প্রথম ঘটনা।
তাদেরকে কখন ফাঁসি
দেয়া হবে তা এখনও জানায়নি সেনাবাহিনী। তবে মিয়ানমারজুড়ে আলোচনা, জল্পনা চলছে, অবিলম্বেই
তাদের ফাঁসি কার্যকর হতে পারে। এটাকে ‘পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ড’ আখ্যা দিয়ে ইতোমধ্যে এর কড়া নিন্দা জানানো
হয়েছে আন্তর্জাতিক মহল থেকে। একে জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের একটা চেষ্টা বলে মন্তব্য
করেছেন জাতিসংঘের দুজন বিশেষজ্ঞ।
মিয়ানমারে জাতিসংঘের
যুদ্ধাপরাধ-সংক্রান্ত তদন্তদলের প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, তিনি মামলাটি নিবিড়ভাবে
পর্যবেক্ষণ করছেন। এ বিচারপ্রক্রিয়া অতি গোপনে চালানো হয়েছে বলে জানিয়ে কুমজিয়ান বলেন,
কোনো বিচারপ্রক্রিয়াকে বস্তুনিষ্ঠ বলে বিবেচনা করতে হলে এটিকে যতটা সম্ভব উন্মুক্ত
রাখতে হয়।
জাতিসংঘের এ কর্মকর্তা
মনে করেন, বস্তুনিষ্ঠ বিচারপ্রক্রিয়ার মৌলিক শর্তগুলো পূরণ না করে মৃত্যুদণ্ড কিংবা
আটকাদেশ দেওয়াটা মানবতাবিরোধী কিংবা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। তিনি বলেন, যেসব
তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিবেচনা করলে দেখা যায় এ বিচার প্রক্রিয়ায়
অভিযুক্ত ব্যক্তির মৌলিক অধিকারগুলো চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে।
গত বছরের (২০২১) নভেম্বরে ইয়াঙ্গুনের একটি ফ্ল্যাট থেকে দুটি পিস্তল, একটি বন্দুক এবং বেশকিছু গুলিসহ ফায়ো জেয়ার থকে আটক করা হয় বলে জানায় জান্তা সরকার। প্রায় একই সময় আটক করা হয় আরও তিনজনকে। এরপর গত চলতি বছরের শুরুর দিকে (জানুয়ারি) এক রুদ্ধদ্বার বিচার প্রক্রিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও সন্ত্রাসের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে ওই চারজনই মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেন। কিন্তু তাদের সেই আপিল নাকচ করে দেওয়া হয়।
এদিকে এই মৃত্যুদণ্ডের
কড়া সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বেশ কিছু দেশ ও অধিকার বিষয়ক সংস্থা। মিয়ানমারে
মানবাধিকার বিষয়ক পরিস্থিতি সম্পর্কিত জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিওর টম অ্যানড্রুজ
এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
উদ্বেগ জানিয়েছেন
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিওর মরিস
টিডবল-বিনজও। তারা বলেছেন, মিয়ামনারের জনতার বিরুদ্ধে প্রতিদিনই ভয়াবহ ও ধারাবাহিক
হামলা চালাচ্ছে সেনাবাহিনী, এটা তারই একটি প্রমাণ। তারা সেখানে বেসামরিক মানুষদের হত্যা
করছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে
সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে ১১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নথি-প্রমাণ
তাদের হাতে এসেছে।
এইচআরডব্লিউ এক
বিবৃতিতে বলেছে, ভিন্ন মতাবলম্বীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তারা সিক্রেট ট্রাইব্যুনালে
এসব বিচার করছে। এছাড়া চলতি মাসে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্ললাইংয়ের
কাছে একটি চিঠি লিখে এ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আর্জি জানিয়েছেন আসিয়ানের চেয়ার
ও কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন।
জবাবে সামরিক
জান্তা ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা কোনোভাবেই পিছপা হবে না। তারা পশ্চিমাদের সমালোচনাকে ‘বেপরোয়া ও হস্তক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। গত বৃহস্পতিবার
সামরিক জান্তার মুখপাত্র বলেছেন, এ শাস্তি যথার্থ।
গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি
বেসামরিক নেত্রী অং সান সুচিকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সুচিসহ
অসংখ্য নেতাকর্মীকে বন্দি করা হয়। এরপর দেশটিতে জান্তাবিরোধী রক্তক্ষয়ী প্রতিবাদ-বিক্ষোভ
শুরু হয়। বিক্ষোভ থামাতে ব্যাপক দমনপীড়ন শুরু করে জান্তা সরকার। এখন পর্যন্ত এক হাজার
৪০০ জনের বেশি আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়েছে।
এছাড়া সম্প্রতি
অং সান সুচিকেও ছয় বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক আদালত। অবৈধভাবে ওয়াকিটকি
আমদানি ও তা নিজের কাছে রাখা, করোনা বিধিনিষেধ লঙ্ঘন ও সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে
সমর্থনের অভিযোগে তাকে এ সাজা দেওয়া হয়।

