
নিত্যনতুন মারণাস্ত্র তৈরির মধ্য দিয়ে বিশ্বের পরাক্রমশালী দেশগুলো নিজেদের সমরশক্তি দেখানোর প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত রয়েছে। এসবের মধ্যে পারমাণবিক বোমা সবচেয়ে বিধ্বংসী ও মানব সভ্যতার জন্য বড় হুমকি। এমন অস্ত্রের অধিকারী দেশগুলো নিজেদের শক্তি যাচাই করে দেখতে বহু পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণও চালিয়েছে পৃথিবীর বুকে। বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহে তারা নিজেদের এই বিশেষ সামর্থ্যের উল্লেখ করে প্রতিপক্ষের উদ্দেশে হুমকি-ধমকি দিয়ে থাকে।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার সাম্প্রতিক যুদ্ধেও এমন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্য মানুষের এমন ভয়কে অনেকটা উসকে দিয়েছে। জাতির উদ্দেশে এক টেলিভিশন ভাষণে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, পশ্চিমারা পারমাণবিক হুমকি দিতে থাকলে তাদের উপযুক্ত জবাব দেয়ার মতো ‘বিপুল অস্ত্রসম্ভার’ রাশিয়ার কাছেও আছে। অস্ত্রসম্ভার বলতে পুতিন স্পষ্টত রুশ পারমাণবিক বোমার প্রতিই ইঙ্গিত দিয়েছেন। রাশিয়ার শীর্ষ পর্যায় থেকে ইউক্রেনে পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগের এই হুমকি কোনো ধাপ্পাবাজি নয় বলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) মনে করছে। সংস্থাটির পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেলের মতে, এই যুদ্ধ বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এমন হুমকি এলে গুরুত্বের সঙ্গেই নিতে হবে।
তবে এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমার ব্যবহার দেখার পর এ ধরনের অস্ত্র প্রয়োগের চিন্তা পরিবর্তন করা উচিত। বাইডেন যা-ই বলুন, এই বিধ্বংসী বোমার ব্যবহার খোদ যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম করে দেখিয়েছে। ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ক্ষত জাপানের ওই দুটি এলাকার মানুষ আজও বয়ে চলেছে। তবে এরপর আর কোথাও মানুষের ওপর এমন বোমা নিক্ষেপ না করলেও যুক্তরাষ্ট্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রাখেনি। বিভিন্ন সময়ে এই বোমার ওপর প্রাথমিক পরীক্ষা চালাতে তারা সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার বেশকিছু ভিডিও চার দশক পর সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।
সিএনএন জানায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বায়ুমণ্ডলে পারমাণবিক বোমার ২১০টি পরীক্ষা চালায়, যার সবগুলোই একাধিক ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষিত এ রকম ১০ হাজার ফিল্ম সম্প্রতি প্রকাশ (ডি-ক্লাসিফায়েড) করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি ভিডিও ইউটিউবে দেখার সুযোগ আছে। এসবের মধ্যে ভূপৃষ্ঠে চালানো বিভিন্ন পরীক্ষার ছবি যেমন আছে, তেমনি আছে বায়ুমণ্ডলে কয়েক হাজার ফুট উঁচুতে মেঘের মধ্যে চালানো অপারেশন ডোমিনিকের ভিডিও। এছাড়া ১৯৪৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নও পারমাণবিক বোমা বানাতে পেরেছিল। তারা ১৯৪৯ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত কাজাখস্তান, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তানে অন্তত ৭২৭টি পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালায়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর এই শক্তির সিংহভাগ চলে আসে রাশিয়ার দখলে। আর তাদের বিজ্ঞানীরা এই বোমার ওপর আরও বিস্তারিত গবেষণার মধ্য দিয়ে এর আয়তন কমিয়ে বিধ্বংসী সামর্থ্যের ব্যাপ্তি ঘটাতে থাকে। তবে রাশিয়া নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার খবর অপ্রকাশিত রাখায় প্রকৃত হিসাব পাওয়া যায়নি।
এছাড়া উপমহাদেশের দুই বৈরী প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়েছে। এনসাইক্লোপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে ভারত প্রথম তাদের আণবিক ক্ষমতা অর্জনের খবর বিশ্ববাসীকে জানায়। পাকিস্তানের জন্য এটা ছিল এক অশনি সংকেত। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে হেরে যাবার পর থেকেই পাকিস্তানে চলছিল আণবিক বোমা তৈরির প্রচেষ্টা। ৮০-এর দশকের মাঝে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিও করে পাকিস্তান। ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারত প্রথম নিজেদের পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালায়। একই মাসে পাকিস্তানও পাঁচটি পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালানোর ঘোষণা দেয়।
বিশ্বের আরেক পরাক্রমশালী দেশ চীনের হাতেও রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র। ১৯৬৪ সালে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালায় বেইজিং। এছাড়া ইসরায়েলেরও রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। তবে তারা কখনোই তাদের এই শক্তিমত্তার বিষয়ে সরাসরি কোনো স্বীকারোক্তি দেয়নি। সবশেষ ২০০৬ সালে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষায় সাফল্য দেখায় উত্তর কোরিয়া। কিন্তু বিভিন্ন মাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়মিত চালালেও পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার বিষয়টি এখনো প্রকাশ্যে আনেনি উত্তর কোরিয়া। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েনটিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৯টি দেশের হাতে ১৪ হাজার ৯০০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে- যার মধ্যে ৬ হাজার ৮০০টির মালিক যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া পারমাণবিক শক্তি নিয়ে জার্মানি, জাপান, সুইডেন, তাইওয়ান, ব্রাজিল, ইরাক, ইরানসহ বেশকটি দেশ কাজ করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)।

